The DU Speech https://www.duspeech.com/2022/11/differences-between-sociololoy-and-social-science.html

সমাজবিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য | সমাজবিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য

 "সমাজবিজ্ঞান" এবং "সামাজিক বিজ্ঞান" শব্দ দুটি অনেকের কাছে এক মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তারা এক নয়। এ দুইয়ের মাঝে তফাৎ রয়েছে। সাধারণত সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী কিংবা সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ছাড়া সমাজবিজ্ঞান এবং সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য সাধারণ মানুষের কাছে ততটা বোধগম্য নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টিকেল রাইটিং সোসাইটির পক্ষ থেকে আজকের আর্টিকেলে থাকবে সমাজবিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য। তাই সমাজবিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য জানতে সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি মনোযোগ সহকারে পড়ুন।

সূচিপত্র(আর্টিকেলের যে অংশ পড়তে চান সেটার ওপর ক্লিক করুন)


1.সমাজবিজ্ঞান কী? | সমাজবিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য 


সমাজবিজ্ঞানের ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Sociology. Sociology শব্দটি এসেছে ল্যাটিন Socious এবং গ্রীক Logos এর সমন্বয়ে। Socious অর্থ হচ্ছে সমাজ এবং Logos শব্দের অর্থ হচ্ছে জ্ঞান। সুতরাং, Sociology শব্দের অর্থ - সমাজের জ্ঞান। সমাজবিজ্ঞান কী? এ প্রশ্নের জবাব বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে দিয়েছেন। বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ভেবার সমাজবিজ্ঞানকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে - "Sociology is a science which attempts at interpretative understanding of social action in order to arrive at a casual explanation of its course and effects" 
অর্থাৎ, "সমাজবিজ্ঞান হচ্ছে এমন একটি বিজ্ঞান যা সামাজিক কাজের মন্ময়গত অনুধাবনের চেষ্টা করে থাকে যাতে করে সামাজিক কাজের গতি এবং ফলাফলের কারণভিত্তিক ব্যাখ্যা প্রদান করা যায়।" 
বর্তমান যুগের প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী অ্যান্থোনি গিডেন্স (১৯৯২) এর মতে, "Sociology is the systematic (or planned and organised) study of human groups and social life in modern societies. It is concerned with the study of social institutions" 
অর্থাৎ, "আধুনিক সমাজের মানবগোষ্ঠী এবং সামাজিক জীবনের নিয়মভিত্তিক (অথবা পরিকল্পিত ও সুবিন্যস্ত) চর্চা হচ্ছে সমাজবিজ্ঞান। "
বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী এমিল দ্যুরখেইম বলেছেন - "সমাজবিজ্ঞান হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞান।" 
সুতরাং, সমাজবিজ্ঞান সম্পর্কে আমরা বলতে পারি, যে শাস্ত্র সমাজের মানুষের উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ, আচার-আচরণ, রীতি-নীতি, ধ্যান-ধারণা,সামাজিক পরিবর্তনসহ সমাজের বিভিন্ন ঘটনাবলীর আলোচনা,সেসবের ব্যাখ্যা প্রদান এবং ভবিষ্যদ্বাণী করে থাকে তাকে সমাজবিজ্ঞান বলে।


2. সমাজবিজ্ঞানের উদ্ভব | সমাজবিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য 

আমরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো সমাজে বাস করি। মানুষ একা বাস করতে সক্ষম নয়। তাই প্রাচীনকাল থেকেই দলবদ্ধ হয়ে বসবাস করে এসেছে মানুষ। এভাবেই মানুষ প্রাচীনকাল থেকেই সমাজবদ্ধ। প্রত্যেক সমাজে কিছু নিয়ম-কানুন রয়েছে। মানুষ সেই নিয়ম মেনে চলে,নিয়ম ভেঙে ফেলে,আবার নতুন নিয়ম গড়ে। এভাবেই ঘটে সামাজিক পরিবর্তন। কোনো সমাজই সমস্যামুক্ত নয়। সামাজিক পরিবর্তনের দরুণ সমাজে নতুন নতুন সামাজিক সমস্যার উদ্ভব হয়েছে। সেসব সমাধানের জন্য মানুষকে খুঁজতে হয়েছে নতুন পথ,আবিষ্কার করতে হয়েছে নতুন পদ্ধতি। সমাজবিজ্ঞান অত্যন্ত আধুনিক একটি বিষয়। মূলত শিল্পবিপ্লবের ফলে সমাজের খুব দ্রুত পরিবর্তনের ফলে যেসব সামাজিক সমস্যার উদ্ভব ঘটেছে,সেসব নিয়ে বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক আলোচনারই একটি মূল উদ্দেশ্য সমাজবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠা।বিষয় হিসেবে নতুন হলেও এর ধারণা কিংবা সমাজবিজ্ঞানের বীজ নতুন নয়,অনেক পুরোনো।প্রিয় পাঠক,চলুন তাহলে এবার জেনে নেয়া যাক কীভাবে উদ্ভব ঘটেছিলো সমাজবিজ্ঞানের।
আমরা হয়তো অনেকেই জানি সমাজবিজ্ঞানের জনক হলেন ফরাসি দার্শনিক অগাস্ট কোঁৎ। তিনি ১৮৩৯ সালে সোশিওলজি শব্দটি প্রণয়ন করেন। তাঁর পাশাপাশি ম্যাক্স ভেবারও সমাজবিজ্ঞানে প্রভূত অবদান রেখেছেন। পুরোপুরি সচেতনভাবে না হলেও সমাজবিজ্ঞান সম্পর্কে প্রথমে ধারণা দেবার চেষ্টা করেন প্লেটো। প্লেটো তাঁর "Republic" নামক বইয়ে সমাজতত্ত্বকে আবির্ভূত করেছেন। প্লেটোর তত্ত্বগুলো যুক্তিযুক্ত হলেও দূর্ভাগ্যজনকভাবে তা ছিলো বাস্তবতা বিবর্জিত। তিনি আদর্শ রাষ্ট্র গঠনের কথা বলেছিলেন যেখানে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। কিন্তু পাঠক,আমিরা জানি,বাস্তবে এমন কোনো আদর্শ রাষ্ট্র স্থাপন করা সম্ভব নয়। 
প্লেটোর পর তাঁর শিষ্য এরিস্টটলও সমাজ সম্পর্কে ব্যাখ্যা প্রদান করার চেষ্টা করেন। এরিস্টটল ছিলেন বাস্তববাদী। তিনি বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং সেসবের বাস্তবভিত্তিক সমাধান দেবার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। এরিস্টটল কথা বলেছেন রাষ্ট্রের গড়ন,শ্রেণি নির্ভর দাস-মনিব সম্পর্ক এবং বিপ্লবের কারণ নিয়ে। তবে প্লেটো - এরিস্টটল উভয়েই দাসপ্রথাকে সমর্থন করেছেন। রাষ্ট্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে দাসপ্রথাকে অপরিহার্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এরপরে ইবনে খালদুন সমাজ সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ইবনে খালদুন তাঁর "Science if Culture" নামক গ্রন্থে সংস্কৃতি, রাষ্ট্র, সামাজিক সংহতি ইত্যাদি সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা করেছেন। তিনি সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য "Social Solidarity" বা সামাজিক সংহতির প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন।খালদুন Social Solidarity কে "আসাবিহা" নামে উল্লেখ করেছেন। 
এরপর ভিকো সমাজ নিয়ে বেশ চিন্তাভাবনা করেছিলেন। তিনি সামাজিক বিবর্তনে বিশ্বাস করতেন। ভিকো তাঁর "The New Science" বইয়ে উল্লেখ করেন, সমাজেরও একটি নির্দিষ্ট নিয়মে বিবর্তন ঘটে৷ সামাজিক বিবর্তনে তিনি তিনটি যুগের কথা বলেন।এগুলো হলোঃ
  • দেবতাদের যুগ (Age of Gods)
  • বীরযোদ্ধাদের যুগ (Age of heros)
  • মণুষের যুগ (Age of men)
এরপর সমাজবিজ্ঞানের জনক অগাস্ট কোঁৎ এর ভূমিকায় আসা যাক। অগাস্ট কোঁৎ তৎকালীন ফ্রান্সের সেরা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছিলেন। ব্যাক্তিজীবনেও তিনি গণিতের শিক্ষকতা করেছেন। অগাস্ট কোঁৎ মনে করতেন,সামাজিক ঘটনাগুলোকেও প্রাকৃতিক ঘটনার মতো কোনো একটি সাধারণ সূত্র দ্বারা ব্যাখ্যা করা সম্ভব। তিনিই সর্বপ্রথম সমাজবিজ্ঞানে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার অবতারণা করেন। অগাস্ট কোঁৎ ছিলেন অঁরি দ্য সাঁ - সিমোঁ-র শিষ্য। অগাস্ট কোঁৎ-ই সর্বপ্রথম সমাজবিজ্ঞানের একটি অন্যতম প্রধান তত্ত্ব "ক্রিয়াবাদ" বা ফাংশনালিজম এর ধারণা দেন। কোঁৎ পরবর্তীতে বহু প্রভাবশালী সমাজবিজ্ঞানীকে প্রভাবিত করেছিলেন। তাঁকে অনুসরণ করে বিভিন্ন তত্ত্ব প্রদান করা হয়েছে। অগাস্ট কোঁৎ এর রচিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাবলী হচ্ছে-
  • ১৮৩০ থেকে ১৮৪২ পর্যন্ত ৬ খন্ডে প্রকাশিত 'কুর দ্য ফিলোসফি পজিটিভ' (Cours de Philosophie Positive)  বা "দৃষ্টবাদী দর্শনের পাঠ"
  • ১৮৫১ থেকে ১৮৫৮ সালের মধ্যে চার খন্ডে প্রকাশিত "সিস্টেম দ্য পলিটিক পজিটিভ" (Systeme de Politique Positive) বা "দৃষ্টবাদী রাজনীতি ব্যাবস্থা"

3. সমাজবিজ্ঞানের বিকাশ | সমাজবিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য 

প্রিয় পাঠক, সমাজবিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য - আর্টিকেলে এবারে আমরা জানবো সমাজবিজ্ঞানের বিকাশ কীভাবে হয়েছিল,কারাই - বা সমাজবিজ্ঞানের বিকাশে অবদান রেখেছিলেন। সমাজবিজ্ঞানকে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে অনেক সমাজবিজ্ঞানী কাজ করেছেন। এদের মধ্যে যাদের কথা উল্লেখ না করলেই না,তাঁরা হলেন এমিল দ্যুরখেইম,কার্ল মার্ক্স,ম্যাক্স ভেবার প্রমুখ। তাঁদের নিয়ে ছোট্ট পরিসরে জানার চেষ্টা করবো। 

এমিল দ্যুরখেইমঃ সমাজবিজ্ঞানের বিকাশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন এমিল দ্যুরখেইম। তাঁকে সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে গণ্য করা হয়। মূলত সমাজবিজ্ঞানকে তিনিই পূর্ণাঙ্গ রূপ দেন। সমাজবিজ্ঞানে এমিল দ্যুরখেইম পদ্ধতিগত আলোচনার অবতারণা ঘটান। অবতারণা করেছেন সমাজবিজ্ঞানকে বিশ্লেষণ করার পদ্ধতিও। সমাজবিজ্ঞানের জনক অগাস্ট কোঁৎ এর মতো তিনিও এ বিষয়কে বস্তুনিষ্ঠ বিজ্ঞান মনে করতেন। সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম দৃষ্টিকোণ ক্রিয়াবাদ (functionalism)  এর জনকও তিনি। 
দ্যুরখেইম সমাজবিজ্ঞানকে ব্যাখ্যার জন্য ঘটনার অবতারণা করাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। Zeitlin যেমন বলেছেন- Social facts are the social structures and cultural norms and values that are external to, and coercive to actors.
অর্থাৎ, সামাজিক ঘটনাবলী হলো সামাজিক কাঠামো, সাংস্কৃতিক নিয়ম এবং মূল্যবোধ - যা যারা সেগুলো পালন করে তাদের কাছে জবরদস্তিমূলক। 
এমিল দ্যুরখেইম সমাজবিজ্ঞানকে দর্শন থেকে আলাদা করতে চেষ্টা করেছেন। যার কারণে সামাজিক ঘটনাবলীকে তিনি "বস্তু" (things) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেছেন,সমাজবিজ্ঞানকে "অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পড়াশোনা" করতে হবে। শুধু দর্শন থেকেই নয়,এমিল দ্যুরখেইম সমাজবিজ্ঞানকে আলাদা করতে চেয়েছেন মনোবিজ্ঞান থেকেও। তিনি উল্লেখ করেছেন- Psychological facts were basically inherited phenomena. 
অর্থাৎ, মনস্তাত্ত্বিক ঘটনাগুলো প্রকৃতপক্ষে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। 
এই সমাজবিজ্ঞানী সামাজিক ঘটনাবলীর বেশ কিছু ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন। যেমন- তিনি উল্লেখ করেছেনঃ "Social facts are external to individuals,constraining upon them, and diffused throughout society with a nature which goes beyond their individual manifestations." 
অর্থাৎ, সামাজিক ঘটনাবলী ব্যাক্তির জন্য বাহ্যিক, তাদের উপর সীমাবদ্ধ ও এটা তাদের স্বতন্ত্র প্রকাশের বাইরে সমাজজুড়ে বিস্তৃত থাকে।
এমিল দ্যুরখেইম উল্লেখ করেছেন,সামাজিক ঘটনাবলীর তিনটি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। এগুলো হলোঃ
  • বাহ্যিকতা (externality) 
  • চাপ(constraints) 
  • সর্বজনীন ব্যাপ্তি (diffusion generality)
অর্থাৎ, তিনি বোঝাতে চেয়েছেন,যেকোনো সামাজিক ঘটনার প্রকাশ ঘটলে তা সমাজের সদস্যদের মধ্যে চাপ সৃষ্টি করে এবং সেটা সবার মাঝে ব্যাপ্ত হয়। মানে,একটি ঘটনা সবাইকেই কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত করে।

সমাজের শ্রম বিভাজনঃ প্রিয় পাঠক, পূর্বেই উল্লেখ করেছি,এমিল দ্যুরখেইম একজন ক্রিয়াবাদী সমাজবিজ্ঞানী। তাই তিনি মনে করতেন,সমাজের ব্যাক্তিদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা ভূমিকা রয়েছে। প্রত্যেকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাজ সমাজকে পরিচালিত করতে সহয়তা করে। এমিল দ্যুরখেইম কথা বলেছেন সামাজিক সংহতি(solidarity) নিয়ে।যেমন-

যান্ত্রিক সংহতিঃ এ ধরনের সংহতিতে সমাজের ব্যাক্তিবর্গ খুব কমই আলাদা থাকে। সমাজের মানুষের আচার-ব্যবহার, চিন্তা-ভাবনা, মূল্যবোধ একই থাকে। যান্ত্রিক সংহতি যন্ত্রের সাথে তুলনীয়। যন্ত্রের যেমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ নিজ নিজ কাজ করে যন্ত্রটিকে চালু রাখে, তেমনি সমাজের মানুষ প্রত্যেকে তার নিজ নিজ অবদান রেখে সমাজকে সচল রাখে।

জৈবিক সংহতিঃ এ ধরনের সংহতিতে সমাজের মানুষের মধ্যে চিন্তা-ভাবনা, আচার-আচরণ,রীতি-নীতিতে সাদৃশ্য থাকে না,কিন্তু ভাষা,জৈবিক সংহতিতে মিল থাকে। এখানে দ্যুরখেইম সমাজকে তুলনা করেছেন মানবদেহের সাথে৷ মানবদেহের যেমন প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আলাদা কিন্তু প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্রিয়া-বিক্রিয়া করে মানবদেহকে সচল রাখে, তেমনি সমাজের মানুষও মিল না থাকলেও যার যার কাজ করে সমাজকে টিকিয়ে রাখে।

এমিল দ্যুরখেইম আরো কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। যেমন-

নৈরাজ্যঃ সমাজবিজ্ঞানী এমিল দ্যুরখেইম এর প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিলো সার্বিক নৈতিকতা। তিনি নৈতিক অবক্ষয়ের কথা উল্লেখ করেছেন৷ তিনি মনে করতেন, ব্যাক্তি নৈরাজ্যের মুখোমুখি হয় তখন যখন নৈতিকতা দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয় না। অর্থাৎ, তার উচিত-অনুচিত বোধের অভাব দেখা দেয়। 

আত্নহত্যাঃএমিল দ্যুরখেইম এর অন্যতম একটি বই ছিলো "La Suicide". তিনি সেখানে আত্নহত্যাকে সামাজিক কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি, আত্নহত্যার যেসব কারণ রয়েছে বলে আমরা জানি সেগুলোকে ভ্রান্ত বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি সর্বমোট চার ধরনের আত্নহত্যার কথা উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলোঃ 
  • আত্নকেন্দ্রিক আত্নহত্যা 
  • পরার্থপর আত্নহত্যা 
  • নৈরাজ্যমূলক আত্নহত্যা
  • ভাগ্যবাদী আত্নহত্যা
আত্নকেন্দ্রিক আত্নহত্যাঃ এ ধরনের আত্নহত্যা তখন ঘটে যখন ব্যাক্তি ও গোষ্ঠীর মধ্যকার বন্ধন দুর্বল হয়। অর্থাৎ, ব্যাক্তির মধ্যে খুব কম সামাজিক যোগাযোগ থাকে। বোগারডাসের ভাষায়, মূলত যে সমাজে সংহতি(solidarity) কম থাকবে সে সমাজে এ ধরনের আত্নহত্যার প্রবণতা অধিক দেখা দেবে। 

পরার্থপর আত্নহত্যাঃ ব্যাক্তি যখন আত্নত্যাগ করে কোনো সামাজিক উদ্দেশ্যে আত্নহত্যা করে। এটি কোনো সমাজের উদ্দেশ্যে নিবেদিত হয়ে আত্নহত্যা। 

নৈরাজ্যমূলক আত্নহত্যাঃ এ ধরনের আত্নহত্যার ওপর গবেষণা করতে এমিল দ্যুরখেইম গভীর আগ্রহ দেখান। তিনি উল্লেখ করেন,আর্থিক অবস্থা ছাড়াও যখন মূল্যবোধের অবক্ষয় হয় তখন মানুষ আত্নহত্যা করে। 

ভাগ্যবাদী আত্নহত্যাঃ যেসব সমাজের অনুশাসন বেশি সেসব সমাজের ব্যাক্তিদের মধ্যে আত্নহত্যার প্রবণতা দেখা দেয়। অধিক সামাজিকতা আত্নহত্যার একটি অন্যতম কারণ।

সুতরাং, আমরা বলতে পারি,সমাজবিজ্ঞানকে একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে এমিল দ্যুরখেইম এর অবদান ছিলো অপরিসীম। সমাজবিজ্ঞান তাঁর কাছে আজীবন ঋণী থাকবে।


কার্ল মার্ক্সঃ সমাজবিজ্ঞানে যার অবদান স্বীকার না করলে "পাপ" হবে তিনি হলেন কার্ল মার্ক্স। মজার বিষয় হচ্ছে,তিনি কোনো সমাজবিজ্ঞানী নয়। এমনকি তাঁর লেখায় কোত্থাও "সমাজবিজ্ঞান" শব্দটি ব্যাবহার করেননি। তবে তাঁর তত্ত্বগুলো সমাজবিজ্ঞানের প্রায় সকল জায়গায় প্রয়োগ করা যায়। তিনি একজন অর্থনীতিবিদ,দার্শনিক। তবে তাঁর লেখায় বোঝা যায়,তিনি বৈপ্লবিক মন-মানসিকতার ছিলেন। কার্ল মার্ক্স কর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর কর্মের মাধ্যমে সমাজকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণের প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। কার্ল মার্ক্সের সমাজতাত্ত্বিক মতবাদ সমাজবিজ্ঞানকে বিশ্লেষণের এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করেছে। তিনি "দ্বান্দ্বিক মতবাদ" দ্বারা সমাজবিজ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছেন। 

বস্তুবাদঃ কার্ল মার্ক্স মানব সমাজকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দুটো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছেন। এগুলো হলোঃ
  • দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ (Dialectical materialism)
  • ঐতিহাসিক বস্তুবাদ (Historical materialism)
দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদঃ দ্বান্দিক শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে "Dialectic". এটা এসেছে গ্রিক Dialeda থেকে, যার অর্থ হচ্ছে বিতর্ক অথবা আলোচনার মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। তবে প্রকৃত অর্থ হচ্ছে - পরস্পরবিরোধী দুটি শক্তির সংঘাতজনিত প্রক্রিয়া। কার্ল মার্ক্সের মাথায় দ্বান্দিক বস্তুবাদের ধারণা আসে মূলত ১৮৪০ সালের শ্রমিক আন্দোলনের ফলে।

ঐতিহাসিক বস্তুবাদঃ এটাকে অন্যভাবেও প্রকাশ করা যায়। যেমনঃ ইতিহাসের বস্তুবাদী ধারণা কিংবা materialist concept of history. ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে স্টালিন ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে- "সামাজিক জীবনপাঠে দ্বন্দমূলক বস্তুবাদের প্রয়োগই হচ্ছে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ।" আবার হান্ট এর মতে, "মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে দ্বন্দমূলক বস্তুবাদের প্রয়োগকেই ঐতিহাসিক বস্তুবাদ হিসেবে গণ্য করা যায়।"

কার্ল মার্ক্স উল্লেখ করেছেন, শ্রমিক শ্রেণী সমাজের কাঠামোর কারণে বিচ্ছিন্নতা অনুভব করে। অর্থাৎ, শ্রমিক তার সামাজিক অস্তিত্বের কিছু ক্ষেত্র থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন অনুভব করে থাকে। কার্ল মার্ক্স দেখিয়েছেন,শ্রমিক শ্রেণী মূলত চার ধরনের উপাদান থেকে বঞ্চিত হয়। এগুলো হলো-
  • উৎপাদনের উদ্দেশ্য থেকে বঞ্চিত হয়
  • উৎপাদিত দ্রব্যসামগ্রী হতে বঞ্চিত হয়
  • পারস্পরিক সহযোগিতা হতে বঞ্চিত হয়
  • মনুষ্যত্ববোধ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়
উৎপাদনের উদ্দেশ্য থেকে বঞ্চনাঃ শ্রমিক শ্রেণী তাদের অক্লান্ত কঠোর পরিশ্রম নিজের জন্য করে না। করে পুঁজিবাদী গোষ্ঠীর জন্য। সে উৎপাদন করে পুঁজিবাদীদের জন্য। অর্থাৎ, পুঁজিবাদীরা শ্রমিকের শ্রমের ফলে মুনাফা লাভ করে।

উৎপাদিত দ্রব্য সামগ্রী থেকে বঞ্চনাঃ শ্রমিক শ্রেণী যেসব পণ্য উৎপাদন করে, সেসবের সবই অধিকার করে পুঁজিবাদী গোষ্ঠী। শ্রমিক সেসব কিছুই পায় না। এর উদাহরণ হিসেবে আমরা বলতে পারি, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে শ্রমিকরা লক্ষ লক্ষ টাকার পোশাক তৈরি করে। কিন্তু সেসব কেনার সামর্থ্য না থাকার ফলে সেগুলো সে ভোগ করতে পারে না। অথচ পোশাকগুলো তার হাতেই বানানো। 

পারস্পরিক সহযোগিতা থেকে বঞ্চনাঃ শ্রমিকরা কাজ করে পাশাপাশি। নিজের কাজটুকু তাকে নিজেকেই করতে হয়। পাশাপাশি বসে কাজ করলেও সাধারণত  কেউ কাউকে সহযোগিতা করে না।

মনুষ্যত্ববোধ থেকে বঞ্চনাঃ শ্রমিক শ্রেণী কাজ করে যন্ত্রের মতো। এভাবে দিনের পর দিন কাজ কাজ করার ফলে সে পরিণত হয় অমানবিক যন্ত্রে। যার কারণে, তার মধ্যে সহানুভূতির মাত্রা হ্রাস পায়। 

উদ্বুদ্ধ তত্ত্বঃ পুঁজিবাদী শ্রেণী শ্রমিককে শোষণ করে সম্পদের স্তুপ করে। চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র অধিক মুনাফা লাভের প্রত্যাশায় তারা শ্রমিকদের দিয়ে অতিরিক্ত পরিশ্রম করায়। দুঃখের বিষয়, এই অতিরিক্ত শ্রমের মূল্যও তারা শ্রমিককে প্রদান করে না। অতিরিক্ত খাটুনির ফলে পুঁজিবাদী গোষ্ঠী যে মুনাফা অর্জন করে তাকে বলা হয়, উদ্বুদ্ধ মূল্য কিংবা surplus value. 

শ্রেণী সংগ্রামের তত্ত্বঃ কার্ল মার্ক্স দেখেছেন,প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের মধ্যে শ্রেণী এবং শ্রেণী সংগ্রাম বিরাজ করছে। দাসদের যুগে দাস-দাস মালিক দুটো ভিন্ন শ্রেণী, সামন্ত যুগে ভূমিদাস-সামন্তপ্রভু দুটো আলাদা শ্রেণী, বর্তমানে পুঁজিবাদী গোষ্ঠী- শ্রমিক শ্রেণী দুটো আলাদা শ্রেণী। কার্ল মার্ক্স শ্রেণীকে দুটো ভাগে ভাগ করেছেন। এগুলো হলো- ক)মুখ্য শ্রেণী খ) গৌণ শ্রেণী।
মুখ্য শ্রেণী হচ্ছে যারা উৎপাদনের সাথে সরাসরি যুক্ত। যেমন- দাস,ভূমিদাস,শ্রমিক শ্রেণী। আর গৌণ শ্রেণী হচ্ছে যারা উৎপাদনের সাথে সরাসরি যুক্ত নয়। যেমন- দাসমালিক,সামন্তপ্রভু,পুঁজিবাদী গোষ্ঠী। 

বুর্জোয়া শ্রেণী সম্পর্কে মার্ক্সের মতবাদঃ কার্ল মার্ক্স সকল শ্রেণীকে দুটো ভাগে ভাগ করেছেন। এক.বুর্জোয়া দুই. প্রলেটারিয়েট। বুর্জোয়া হচ্ছে তারা যাদের সব আছে। যাদের সম্পদ, টাকা আছে। আর প্রলেটারিয়েট হচ্ছে যারা সর্বহারা,যাদের কিচ্ছু নেই। বুর্জোয়া শ্রেণী প্রলেটারিয়েটদেরকে শোষণ করে অধিক মুনাফার আশায়। তারা প্রলেটারিয়েটদেরকে বঞ্চিত করে সম্পদ গড়ে তোলে।
তবে কার্ল মার্ক্স মনে করতেন, একদিন শ্রমিক শ্রেণী ঐক্যবদ্ধ হবে। তারা পুঁজিবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করবে। বিপ্লব হবে এবং একসময় ধনতান্ত্রিক সমাজ নিপাত যাবে। গড়ে উঠবে সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা।  

ধর্মের ব্যাপারে কার্ল মার্ক্সের মতবাদঃ কার্ল মার্ক্স মনে করতেন, ধর্ম হচ্ছে পুঁজিবাদের তৈরি করা আইন। একে ঐশ্বরিক রূপ দেয়া হয়েছে এবং সেসব কথাই বলা হয়েছে যেগুলো চালু থাকলে পুঁজিবাদীদের শোষণ করা সুবিধা হবে৷ পাশাপাশি, শ্রমিক শ্রেণির ক্ষোভ অবদমন,প্রশমণ করার জন্যও ধর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সুতরাং, সার্বিক আলোচনা থেকে আমরা বলতে পারি,সমাজবিজ্ঞানী না হয়েও কার্ল মার্ক্সের সমাজবিজ্ঞানে অবদান অপরিসীম।
সুপ্রিয় পাঠক, সমাজবিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য - আর্টিকেলটিতে এবারে আমরা জানবো ম্যাক্স ভেবার সম্পর্কে। তিনি কীভাবে সমাজবিজ্ঞানে অবদান রেখে সমাজবিজ্ঞানকে বিকশিত করতে সহয়তা করেছিলেন তা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা নেবো।

ম্যাক্স ভেবারঃ জার্মান দার্শনিক,আইনজীবী ম্যাক্স ভেবার মূলত বিখ্যাত সামাজিক ঘটনাগুলিতে যুক্তিবাদিতার উদ্ভব ঘটানোর জন্য। এছাড়া তিনি আমলাতন্ত্রের ধারণাকেও সমৃদ্ধ করেছেন। ম্যাক্স ভেবারের কাজের একটি বড় ক্ষেত্র হচ্ছে সামাজিক স্তরবিন্যাস। যদিও এ সম্পর্কে কার্ল মার্ক্স তাঁর মতবাদ ব্যাক্ত করেছিলেন। তবে ম্যাক্স ভেবার সেটা ভিন্ন আঙ্গিকে দেখেছেন। কার্ল মার্ক্স যেখানে সামাজিক স্তরবিন্যাসকে ব্যাখ্যা করেছেন দ্বান্দিক দৃষ্টিকোণ থেকে,ম্যাক্স ভেবার সেটাকে ব্যাখ্যা করেছেন ক্রিয়াবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে। চলুন পাঠক, জেনে নেই কেমন ছিলো ম্যাক্স ভেবারের সেই ব্যাখ্যা।

সামাজিক স্তরবিন্যাসঃ সামাজিক স্তরবিন্যাসের ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে social stratification. Stratification শব্দটি এসেছে ল্যাটিন Stratum থেকে। যার দ্বারা ভূমির বিভিন্ন স্তরকে বোঝায়। তেমনি আমাদের সমাজে বিভিন্ন ধরনের মানুষ বাস করে। তাদের মধ্যকার ভিন্নতাকেই বলা হয় social stratification.  এই ভিন্নতা লিঙ্গ,বর্ণ,অর্থনৈতিক অবস্থা,জ্ঞান প্রভৃতিভেদে ঘটে থাকে। সবাইকে সমান চোখে দেখা হয় না। এটাকে বলে স্তরবিন্যাস। সামাজিক স্তরবিন্যাস সার্বজনীন একটি বিষয়। প্রত্যেক সমাজেই তা আছে। মূলত, who gets what and why - এই প্রশ্নকে সামনে রেখেই সামাজিক স্তরবিন্যাস গঠিত হয়েছে। 

ম্যাক্স ভেবারের মতবাদঃ ম্যাক্স ভেবার মনে করতেন,সমাজে বিদ্যমান দ্বন্দ হচ্ছে বহুমাত্রিক। সবখানেই বিভিন্ন দ্বন্দ বিদ্যমান। পাশাপাশি এই দ্বন্দগুলো ঘটার কারণসমূহও যৌক্তিক। অর্থনৈতিক, সামাজিক,বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভৃতি দ্বন্দ সর্বত্র বিরাজমান থাকার কারণে সামাজিক স্তরবিন্যাস অপরিহার্য। 

ক্ষমতা ও শ্রেণীবিভাগঃ ম্যাক্স ভেবার বলেছেন, রাষ্ট্রই সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে। রাষ্ট্র তার আইন দ্বারা সমাজ তথা সমাজের মানুষের ওপর শারীরিক ও মানসিকভাবে একচেটিয়া ক্ষমতা প্রয়োগ করে। এভাবে যে রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকে, সে অনেক ক্ষমতাশালী হয়। সরকারের অনেক ক্ষমতা থাকার কারণে তার কিছু বিরোধী শক্তি গঠিত হয় সে ক্ষমতা দখল করার জন্য।
 
ক্ষমতা ও শ্রেণিশক্তিঃ ম্যাক্স ভেবার মনে করতেন, আইন সমন্ধনীয় নির্দেশ একে অপরের সাথে সংযুক্ত। এটা অনেকাংশে সুযোগ-সুবিধার ওপর নির্ভর করে। যারা রাষ্ট্রের ক্ষমতা বা সম্মান রক্ষা করতে পারবে তারাই ক্ষমতাসীন হবে। কিন্তু একই দলে সেই অধিকার আজীবন থাকে না। সেজন্য ক্ষমতার রদবদল ঘটে।

শ্রেণিদলের ক্ষমতা ও ব্যবহারঃ শ্রেণী হলো ব্যাক্তির সমষ্টি যারা জীবনধারণের জন্য অথবা মৌলিক অধিকার আদায়ের জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে। সামজিক স্তরবিন্যাসের কারণেই ক্ষমতা বণ্টিত হয়ে থাকে। 

শ্রেণি অবস্থা ও মর্যাদাঃ ভেবার যদিও এ দুটিকে আলাদা করতে চেয়েছেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি ব্যার্থ হয়েছেন। মর্যাদা অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে - যেটা কার্ল মার্ক্স আগেই উল্লেখ করেছেন। 

সামাজিক স্তরবিন্যাসের সামাজিক মূল্যায়নঃ প্রিয় পাঠক, পূর্বেই উল্লেখ করেছি,স্তরবিন্যাস একটি সার্বজনীন বিষয়। পৃথিবীর সকল সময়ে সকল সমাজে স্তরবিন্যাস বিরাজমান ছিল,আছে,থাকবে। সমাজ পরিবর্তন হয়েছে, পরিবর্তিত হয়েছে এর ধারা, মূল্যবোধ,কাঠামো ইত্যাদি- কিন্তু স্তরবিন্যাস রয়ে গেছে। ম্যাক্স ভেবারের মতে,সামাজিক স্তরবিন্যাস থাকাটা একটি যুক্তিযুক্ত বিষয়। 

আমলাতন্ত্রঃ ম্যাক্স ভেবারের কাজের অন্যতম একটি বিষয় হচ্ছে - আমলাতন্ত্র। তিনি আমলাতন্ত্রের একটি সুবিন্যস্ত কাঠামো হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে,আমলাতন্ত্রের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এগুলো হলোঃ
  • কর্ম পরিধি
  • নিয়োগ পদ্ধতি 
  • পদ সোপান নীতি
  • কর্মবণ্টন/বিভাগীয়করণ
  • টেকনিক্যাল জ্ঞান
  • লিখিত বিধিবিধান 
  • বেতন-ভাতা
  • নিরপেক্ষতা 
  • অফিশিয়াল রেকর্ড
  • পেশাদারিত্ব
সুতরাং, সার্বিক আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারলাম,সমাজবিজ্ঞানে ম্যাক্স ভেবার অনেক অবদান রেখেছেন।সমাজবিজ্ঞান বিকাশে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। 

4. সমাজবিজ্ঞানের আলোচ্য-বিষয়বস্তু | সমাজবিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য 

নাম শুনেই বোঝা যায়, সমাজে যা যা আছে সেসবের বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা ও ব্যাখ্যাই হচ্ছে সমাজবিজ্ঞান। সুতরাং, সমাজবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়বস্তু হবে, সমাজে যা যা আছে তা নিয়ে। মনুষ্য সমাজে মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক  সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে সমাজবিজ্ঞান। সমাজবিজ্ঞান একপাক্ষিক বিচার করে না। সমাজবিজ্ঞানে চার ধরনের দৃষ্টিকোণ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে- 
  • দ্বান্দিক দৃষ্টিকোণ 
  • ক্রিয়াবাদী দৃষ্টিকোণ 
  • সাংকেতিক মিথস্ক্রিয়া 
  • নারীবাদী দৃষ্টিকোণ 
দ্বান্দিক দৃষ্টিকোণঃ এই দৃষ্টিকোণ হচ্ছে সমাজের যেকোনো ঘটনাকে দ্বান্দিকভাবে দেখে। সমাজের সকল ক্ষেত্রে দ্বন্দ বিদ্যমান। সম্পদ এবং ক্ষমতার অসমতার কারণে শ্রেণিবিভাগ দেখা যায়,সেই সাথে দেখা যায় দ্বন্দ। পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র,পুরো বিশ্বজুড়েই রয়েছে শ্রেণি এবং ক্ষমতার দ্বন্দ।

ক্রিয়াবাদী দৃষ্টিকোণঃ এই দৃষ্টিকোণে সমাজে বিরাজমান সবকিছুকে এবং সব ঘটনাকে প্রয়োজনীয় মনে করে। যা যা ঘটছে তার পেছনে যৌক্তিক কারণ আছে - এটাই মনে করেন ক্রিয়াবাদীরা। একটা মানবদেহ সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য যেমন সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে নিজ নিজ কাজ করতে হয়,নাহলে অসুখ দেখা দেয়; ঠিক তেমনি সমাজের প্রত্যেক পেশাজীবীদেরকে নিজ নিজ কাজ করতে হয়, তা নাহলে সমাজে বিশৃঙ্খখলা দেখা দেয়। যেটাকে সমাজবিজ্ঞানীরা বলেছেন dysfunction. 

সাংকেতিক মিথস্ক্রিয়াঃ এই দৃষ্টিকোণে যেকোনো সামাজিক ঘটনাকে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে দেখা হয়। দ্বান্দিক এবং ক্রিয়াবাদী দৃষ্টিকোণে যেকোনো সামাজিক ঘটনাকে বৃহৎ পরিসরে দেখা হয়, যেখানে সাংকেতিক মিথস্ক্রিয়ায় মানুষে-মানুষে সম্পর্ক ছোট পরিসরে বিশ্লেষণ করা হয়। 

নারীবাদী দৃষ্টিকোণঃ নারীবাদীরা মনে করেন,ইতিহাসে নারীরা সবসময়ই বঞ্চিত, নিষ্পেষিত, নির্যাতিত হয়ে এসেছে। পুরুষরা কখনোই নারীকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দেয় নি। কার্ল মার্ক্স যেখানে মানব ইতিহাসকে শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস বলেছেন,নারীবাদীরা সেখানে মানব্জাতির ইতিহাসকে নারী-পুরুষের দ্বান্দিক ইতিহাস বলেছেন। 

সুতরাং, সমাজবিজ্ঞান সমাজে মানুষে মানুষে সম্পর্ক স্থাপিত হবার ফলে যা যা ঘটে তার সবকিছু নিয়েই আলোচনা করে। 


5.সামাজিক বিজ্ঞান কী? | সমাজবিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য 

সামাজিক বিজ্ঞান হচ্ছে সমন্বিত বিজ্ঞান। এটি জ্ঞানের এমন একটি শাখা যা সমাজ এবং মানবিক আচরণ নিয়ে পড়াশোনা করে। সামাজিক বিজ্ঞানকে সাধারণত জ্ঞানের একটি বিরাট ক্ষেত্র বলা যায়। সামাজিক বিজ্ঞান কয়েকটি বিষয়ের সমন্বয়ে সংগঠিত। যেমনঃ
  • সমাজবিজ্ঞান 
  • নৃবিজ্ঞান 
  • অপরাধ বিজ্ঞান
  • অর্থনীতি 
  • আইন
  • ইতিহাস
  • ভাষাবিজ্ঞান
  • রাষ্ট্রবিজ্ঞান 
  • আন্তর্জাতিক সম্পর্ক 
  • মানবিক ভূগোল
  • মনোবিজ্ঞান
  • পরিবেশ বিজ্ঞান
  • সমাজকর্ম
  • লোকপ্রশাসন
  • শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন
  • টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অধ্যয়ন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদের ১৬ টি বিষয় চালু রয়েছে।


6. সমাজবিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য  | সমাজবিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য 

প্রিয় পাঠক,এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন - সমাজবিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য। সমাজবিজ্ঞান হচ্ছে সামাজিক বিজ্ঞানের একটি অনুষদ৷ অপরদিকে, সামাজিক বিজ্ঞান হচ্ছে সমাজ সম্পর্কিত কতগুলো বিষয়ের সমষ্টি। সমাজবিজ্ঞান একটি বিষয়, সামাজিক বিজ্ঞান একটি অনুষদ। সামাজিক বিজ্ঞানের সমস্ত বিষয়গুলোর একটা বিস্তৃত আলোচনা করে সমাজবিজ্ঞান। সামাজিক বিজ্ঞানের অন্যান্য বিষয়সমূহ যেমন - রাষ্ট্রবিজ্ঞান,অর্থনীতি, লোকপ্রশাসন প্রভৃতির একটা সংক্ষেপ - সার্বিক আলোচনা করে সমাজবিজ্ঞান।  আর সামাজিক বিজ্ঞানের বাকি বিষয়গুলো তাদের নিজস্ব বিষয় নিয়ে অতি গভীরে আলোচনা করে,যেটা সমাজবিজ্ঞান করে না।
প্রিয় পাঠক,আশা করি,আমরা আর সমাজবিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য করতে ভুল করবো না।


7. পাঠকের প্রশ্ন-উত্তর | সমাজবিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য 

প্রশ্ন-০১ঃ সমাজবিজ্ঞানের জনক কে?
উত্তরঃ অগাস্ট কোঁৎ 
প্রশ্ন-০২ঃ সমাজবিজ্ঞানের বিকাশে অবদান রেখেছেন কারা?
উত্তরঃ এমিল দ্যুরখেইম, কার্ল মার্ক্স, ম্যাক্স ভেবার প্রমুখ।
প্রশ্ন-০৩ঃ ক্রিয়াবাদী দৃষ্টিকোণের জনক কে?
উত্তরঃ এমিল দ্যুরখেইম। 
প্রশ্ন-০৪ঃ একজন দ্বান্দিক দৃষ্টিকোণের সমাজবিজ্ঞানীর নাম উল্লেখ করো।
উত্তরঃ কার্ল মার্ক্স। 
প্রশ্ন-০৫ঃ আমলাতন্ত্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন কে?
উত্তরঃ ম্যাক্স ভেবার।
প্রশ্ন-০৬ঃ কার্ল মার্ক্স মানব ইতিহাসকে কীসের সংগ্রাম বলেছেন?
উত্তরঃ শ্রেণি-সংগ্রামের।
প্রশ্ন-০৭ঃ সমাজবিজ্ঞানে মোট কত ধরনের দৃষ্টিকোণ রয়েছে?
উত্তরঃ চার ধরনের। 
প্রশ্ন-০৮ঃ সামজিক বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তরঃ সামাজিক বিজ্ঞান একাধিক বিষয়ের সমন্বয়ে গঠিত, সমাজবিজ্ঞান সামাজিক বিজ্ঞানের একটি বিষয়। প্রশ্ন-০৯ঃ কোনটি সামাজিক বিজ্ঞানের মাতৃবিষয়?
উত্তরঃ সমাজবিজ্ঞান 
প্রশ্ন-১০ঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে কতগুলো বিষয় চালু রয়েছে? 
উত্তরঃ ১৬ টি।


8. লেখকের মন্তব্য |সমাজবিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য 

প্রিয় পাঠক, দেখতে দেখতে সমাজবিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য আর্টিকেলের একদম শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছালাম। আশা করি, আপনারা সকলেই বুঝতে পেরেছেন সমাজবিজ্ঞান সামাজিক বিজ্ঞানের একটি বিষয়। সমাজবিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য অন্তর্নিহিত রয়েছে। আপনার যেকোনো মতামত আমরা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হবে। তাই অকপটে লিখে ফেলুন আপনার জিজ্ঞাসা কিংবা অনুভূতি। সকলে ভালো থাকবেন। সবার জন্য শুভকামনা। 

পরিচিতদেরকে জানাতে শেয়ার করুন

0 Comments

দয়া করে নীতিমালা মেনে মন্তব্য করুন ??

অর্ডিনারি আইটি কী?