ট্রল আর বুলিংয়ের আড়ালে এক নিভৃতচারী পণ্ডিত: ঢাবি অধ্যাপক ড. তাশরিক ই-হাবিব

 


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক অদ্ভুত জায়গা। এখানে মুহূর্তের মধ্যে একজন মানুষকে যেমন আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা দেওয়া যায়, তেমনি সামান্য একটি ভুলের কারণে তাকে নিয়ে শুরু হয় তীব্র ট্রলিং ও সাইবার বুলিং। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের একজন শিক্ষকের একটি গান গাওয়ার ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়। বেসুরে গাওয়ার কারণে নেটিজেনদের হাসাহাসি, ট্রল আর মিমের প্রধান খোরাকে পরিণত হন তিনি।

কিন্তু ফেসবুকের এই খণ্ডিত চিত্র কি একজন মানুষের সামগ্রিক পরিচয় হতে পারে? ৫ মিনিটের একটি ভিডিওর ওপর ভিত্তি করে আমরা কি একজন মানুষের সারাজীবনের সাধনাকে বিচার করতে পারি? নেটিজেনরা যাকে নিয়ে আজ মেতে আছেন, সেই ড. তাশরিক-ই-হাবিব আসলে কে? তাঁর মেধা, মনন ও গবেষণার গভীরতা সম্পর্কে জানলে হয়তো অনেক ট্রলকারীরই মাথা শ্রদ্ধায় অবনত হবে। বইয়ের প্রচ্ছদে থাকা তাঁর পরিচিতি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই গুণী গবেষকের বর্ণাঢ্য অ্যাকাডেমিক ও পেশাগত জীবনের একটি বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হলো।

শিক্ষকতার মহান ব্রতে ড. তাশরিক-ই-হাবিব

ড. তাশরিক-ই-হাবিব বর্তমানে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের একজন সম্মানিত সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করা এবং সহযোগী অধ্যাপকের পদে আসীন হওয়া কোনো সাধারণ বিষয় নয়; এর পেছনে রয়েছে নিরলস অধ্যবসায় এবং তীক্ষ্ণ মেধার স্বাক্ষর।

তবে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের শুরু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়। তিনি এর পূর্বে ময়মনসিংহের ত্রিশালে অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের প্রভাষক হিসেবে সাফল্যের সাথে তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন। সেখান থেকেই তিনি তাঁর অ্যাকাডেমিক উৎকর্ষের প্রমাণ দিয়ে দেশের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের স্থান করে নেন।

গবেষণায় অনন্য স্বীকৃতি: ইউজিসি স্বর্ণপদক ও ফেলোশিপ

একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের মূল কাজ শুধু ক্লাসে পড়ানো নয়, বরং নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। ড. তাশরিক-ই-হাবিব সেই গবেষণার জগতেই একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। বাংলা সাহিত্য বিষয়ক গবেষণায় অসামান্য ও মৌলিক অবদানের জন্য তিনি ‘ইউজিসি স্বর্ণপদক ২০১৮’ অর্জন করেন। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক প্রদত্ত এই পদক দেশের যেকোনো গবেষকের জন্য সর্বোচ্চ সম্মানের বিষয়।

শুধু তাই নয়, ২০১৮ সালে তিনি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের ‘ইউজিসি পোস্ট-ডক্টরাল ফেলোশিপ ২০১৮’-এর মনোনীত ফেলো নির্বাচিত হন। এই ফেলোশিপের অধীনে তিনি প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের কথামালা ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে গভীর গবেষণা সম্পন্ন করেছেন।

এমফিল ও পিএইচডি: গবেষণায় নতুন মাত্রার সংযোজন

ড. তাশরিক-ই-হাবিবের উচ্চতর ডিগ্রির গবেষণাগুলো বাংলা সাহিত্যের অ্যাকাডেমিক পরিমণ্ডলে অত্যন্ত সমাদৃত। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১২ সালে এমফিল (MPhil) ডিগ্রি এবং ২০১৭ সালে পিএইচডি (PhD) ডিগ্রি অর্জন করেন।

এমফিল অভিসন্দর্ভ (MPhil Thesis)

তাঁর এমফিল গবেষণার বিষয় ছিল ‘বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্পে প্রান্তজনের জীবনচিত্র’। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণের লেখায় কীভাবে সমাজের নিচুতলার, অবহেলিত ও প্রান্তিক মানুষের জীবনচিত্র ফুটে উঠেছে, তা তিনি নিপুণভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। সবচেয়ে বিস্ময়কর ও গৌরবের বিষয় হলো, তাঁর এই এমফিল গবেষণা অভিসন্দর্ভটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত প্রথম ও এখনো পর্যন্ত একমাত্র এমফিল গবেষণা অভিসন্দর্ভ হিসেবে গ্রন্থরূপ পাওয়ার বিরল মর্যাদা লাভ করেছে।

পিএইচডি অভিসন্দর্ভ (PhD Thesis): 

তাঁর পিএইচডি গবেষণার বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশের উপন্যাসে লোকজ উপাদানের ব্যবহার’। আধুনিক উপন্যাসের সাথে আবহমান বাংলার শেকড়ের উপাদানগুলো কীভাবে মিশে আছে, তা নিয়ে তাঁর এই মৌলিক ও ভিন্নধর্মী গবেষণা অ্যাকাডেমিক মহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। এই অসামান্য কাজের জন্য তিনি ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির সম্মানজনক ‘রিসার্চ গ্র্যান্ট’ লাভ করেন।

দেশের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশনা

ড. তাশরিক-ই-হাবিব কেবল ডিগ্রি অর্জনের জন্যই গবেষণা করেননি; তাঁর প্রবন্ধ ও গবেষণাপত্র দেশের প্রায় সকল স্বনামধন্য ও পিয়ার-রিভিউড জার্নালে নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর গবেষণার ব্যাপ্তি ও গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু, তা নিচের তালিকাটি দেখলেই অনুধাবন করা যায়। তাঁর লেখা প্রকাশ পেয়েছে যেসব স্বনামধন্য পত্রিকায়:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: ‘সাহিত্য পত্রিকা’, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা’, ‘কলা অনুষদ পত্রিকা’, এবং ‘প্রাচ্যবিদ্যা পত্রিকা’।

জাতীয় প্রতিষ্ঠান: ‘বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি পত্রিকা’, ‘বাংলা একাডেমি পত্রিকা’, এবং ‘বাংলা একাডেমি ফোকলোর পত্রিকা’।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়: ‘ভাষা-সাহিত্যপত্র’।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়: ‘সাহিত্যিকী’।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (রংপুর): ‘বাংলা গবেষণা সংসদ’।

রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়: ‘রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা’।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় (ময়মনসিংহ): ‘মানবিদ্যা গবেষণাপত্র’।

বাংলাদেশের এমন কোনো মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য বা কলা অনুষদীয় গবেষণা পত্রিকা নেই, যেখানে তাঁর মেধার পদচারণা ঘটেনি।


প্রকাশিত গ্রন্থাবলি:
 সমালোচনা ও গবেষণার অমূল্য দলিল
গবেষণাপত্রের পাশাপাশি ড. তাশরিক-ই-হাবিব সাহিত্য সমালোচনা ও গবেষণামূলক বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন, যা বাংলা সাহিত্যের শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান পাঠ্য। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
প্রকাশনার সাল
গ্রন্থের নাম
বিষয়বস্তু / ধরন
২০১৫
গল্পকার শহীদুল জহির
জাদুবাস্তবতার লেখক শহীদুল জহিরের সাহিত্যকর্মের বিশ্লেষণ
২০১৬
নজরুলের যুগবাণী ও অন্যান্য
কাজী নজরুল ইসলামের প্রবন্ধ ও যুগবাণী বিষয়ক আলোচনা
২০১৭
গল্পকথন
কথাসাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ সংকলন
২০১৭
গদ্যশিল্প বিষয়ক
গদ্যের নান্দনিকতা ও শিল্পরূপ বিষয়ক গবেষণা
২০১৮
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্পে প্রান্তজনের জীবনচিত্র
এমফিল গবেষণার গ্রন্থরূপ
২০২০
আমার স্মৃতিকথায় আনিসুজ্জামান
জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে নিয়ে স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থ
২০২১
বাংলাদেশের উপন্যাসে লোকজ উপাদানের ব্যবহার
পিএইচডি গবেষণার গ্রন্থরূপ
সম্পাদনায় মুনশিয়ানা
মৌলিক গবেষণা ও প্রবন্ধ রচনার পাশাপাশি সম্পাদনার কাজেও তিনি অত্যন্ত দক্ষ। তিনি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) এবং বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির মতো দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য সাতটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের পুনঃসম্পাদনার দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করেছেন।

শেষ কথা:
 ভার্চুয়াল বিচার বনাম বাস্তবতার ক্যানভাস
একজন ড. তাশরিক-ই-হাবিব রাতারাতি তৈরি হন না। দশকের পর দশক লাইব্রেরির ধুলোমাখা বইয়ের গন্ধ শুঁকে, রাত জেগে পাণ্ডুলিপি তৈরি করে, দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাহিত্যকে ভালোবেসে তবেই একজন মানুষ এমন একটি সমৃদ্ধ প্রোফাইল তৈরি করতে পারেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি শখের গান বা ব্যক্তিগত মুহূর্তের বেসুরো পরিবেশনা কখনো তাঁর এই সুবিশাল অ্যাকাডেমিক অর্জনকে ম্লান করতে পারে না। বরং, নেটিজেনদের এই ট্রলিং আমাদের সমাজের একটি রূঢ় বাস্তবতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—আমরা মানুষের সারাজীবনের সাধনাকে পাশ কাটিয়ে তার একটি ছোট ভুল বা দুর্বলতাকে নিয়ে মেতে থাকতে বেশি পছন্দ করি।
ড. তাশরিক-ই-হাবিব একজন স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং বাংলা সাহিত্যের নিবেদিতপ্রাণ সেবক। ফেসবুকের ক্ষণস্থায়ী ট্রল বা বুলিংয়ের স্রোতে তাঁর মতো একজন গুণী মানুষের প্রকৃত পরিচয় যেন হারিয়ে না যায়, সেটাই এখন সবচেয়ে বেশি কাম্য। তাঁর লেখা বই, প্রবন্ধ এবং গবেষণা আগামী প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে, আর ট্রলকারীদের মিমগুলো কালের গহ্বরে হারিয়ে যাবে—এটাই ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

The DU Speech-এর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন, প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়

comment url