The DU Speech https://www.duspeech.com/2022/08/premendramitra-brief-history.html

প্রেমেন্দ্র মিত্রের সংক্ষিপ্ত জীবনি

 বহুমুখী প্রতিভাবান প্রেমেন্দ্র মিত্র 

সৃজনশীল ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী বাংলা সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র।প্রেমেন্দ্র মিত্র একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক,  ছোটগল্পকার, সাংবাদিক এবং চিত্রপরিচালক ছিলেন।প্রেমেন্দ্র মিত্র কল্লোল গোষ্ঠীর একজন লেখক ছিলেন।সাধারণ মানুষের প্রতি অনুরাগ থেকে প্রেমেন্দ্র মিত্রের সাহিত্য রচনা শুরু।প্রেমেন্দ্র মিত্র রচিত সাহিত্যের বিভিন্ন চরিত্র ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। বাংলা সাহিত্যের এই গুণীজন সম্পর্কে আজ আমরা জানার চেষ্টা করবো।


     সংবাদ সূচীপত্র 

     ✪প্রেমেন্দ্র মিত্রের জন্মপরিচয় 

     ✪প্রেমেন্দ্র মিত্রের শিক্ষাজীবন 

     ✪প্রেমেন্দ্র মিত্রের কর্মজীবন 

     ✪প্রেমেন্দ্র মিত্রের সাহিত্যে পদচারণ 

     ✪প্রেমেন্দ্র মিত্রের বিবিধ সাহিত্যকর্ম

     ✪কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যে প্রেমেন্দ্র মিত্র 

     ✪চলচ্চিত্র ও প্রেমেন্দ্র মিত্র 

      ✪প্রেমেন্দ্র মিত্রের পুরষ্কার ও সম্মাননা 

     ✪প্রেমেন্দ্র মিত্রের মৃত্যু 


প্রেমেন্দ্র মিত্রের জন্মপরিচয়

প্রেমেন্দ্র মিত্র ১৯০৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর অবিভক্ত ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের বারানসীর কাশীতে পিতার কর্মস্থলে জন্মগ্রহণ  করেন।প্রেমেন্দ্র মিত্র ছিল সম্ভ্রান্ত মিত্র পরিবারের সন্তান।প্রেমেন্দ্র মিত্রের পিতার নাম জ্ঞানেন্দ্রনাথ মিত্র এবং মাতার নাম সুহাসিনী দেবী। প্রেমেন্দ্র মিত্রের পিতা রেলওয়েতে চাকরি করতেন। প্রেমেন্দ্র মিত্রের পৈতৃক নিবাস ছিল পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলার রাজপুর গ্রামে।অল্প বয়সে প্রেমেন্দ্র মিত্রের মা মারা গেলে তার শৈশব কাটে মামা বাড়িতে।প্রেমেন্দ্র মিত্রের মামাবাড়ি ছিল মির্জাপুরে।প্রেমেন্দ্র মিত্রের জীবনসঙ্গীর নাম বীণা মিত্র।

প্রেমেন্দ্র মিত্রের শিক্ষাজীবন 

প্রেমেন্দ্র মিত্র ১৯২০ সালে কলকাতার সাউথ সুবার্বন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।এরপর ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছে থেকে প্রেমেন্দ্র মিত্র সাউথ সুবার্বান কলেজে(বর্তমানে আশুতোষ কলেজ) ভর্তি হন।এর কিছুদিন পর প্রেমেন্দ্র মিত্র ইচ্ছা পাল্টে কৃষিবিদ্যা শেখার উদ্দেশ্যে শ্রীনিকেতনে ভর্তি হন।এরপর তা ছেড়ে আবার ডাক্তারি পড়ার জন্য ঢাকায় চলে আসেন।এখানে প্রেমেন্দ্র মিত্র সায়েন্স নিয়ে জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন।প্রেমেন্দ্র মিত্র বাঁধা ধরা শিক্ষা গ্রহণের নিয়ম একদমি পছন্দ করতেন না তাই তাঁর শিক্ষাজীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।



প্রেমেন্দ্র মিত্রের কর্মজীবন 

প্রথম জীবনে প্রেমেন্দ্র মিত্র বিভিন্ন ধরনের কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন।প্রেমেন্দ্র মিত্র বেঙ্গল ইমিউনিটিতে কিছুদিন বিজ্ঞাপনের কপি লেখক হিসেবে কাজ করেছেন।এরপর প্রেমেন্দ্র মিত্র যুক্ত হন চলচ্চিত্রের সঙ্গে।প্রথমে কিছুদিন একটা ফিল্ম কোম্পানির পাবলিসিটি অফিসার হিসেবে কাজ করেছেন।পরিচালক প্রমথেশ বড়ুয়ার কথায় 'রিক্তা' চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা করলে তা সফলতা লাভ করে।এরপর প্রেমেন্দ্র মিত্র চিত্রনাট্যকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন।প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রায় ১৪টি চলচ্চিত্রের পরিচালনা করেছেন।পরে এই পেশা ছেড়ে প্রেমেন্দ্র মিত্র আবারো লেখালেখিতে যোগ দেন।প্রেমেন্দ্র মিত্র কল্লোল পত্রিকার প্রধান সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব্য হিসেবে স্বীকৃত।এরপর প্রেমেন্দ্র 'বাংলার কথা' 'বঙ্গবাণী' 'সংবাদ' প্রভৃতি পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করেছেন।

প্রেমেন্দ্র মিত্রের সাহিত্যে পদচারণ

প্রেমেন্দ্র মিত্র শৈশব থেকেই সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন।জগন্নাথ কলেজে পড়াকালীন তিনি কলকাতায় মাঝে মাঝে আসা যাওয়া করতেন।কলকাতায় প্রেমেন্দ্র মিত্র ২৮ নং গোবিন্দ ঘোষাল লেনের মেসে থাকতেন।১৯২৩ সালের নভেম্বরে যখন প্রেমেন্দ্র মিত্র এই বাড়িতে আসেন তিনি তাঁর ঘরের জানালার পাশে পোস্টকার্ড পান।চিঠিটা পড়তে পড়তে প্রেমেন্দ্র মিত্রের মনে দুটি গল্প আসে।প্রেমেন্দ্র মিত্র সে রাতেই গল্প দুটি লিখে তৎকালীন জনপ্রিয় পত্রিকা 'প্রবাসী'তে পাঠিয়ে দেন।এরপর ঢাকায় এসে অপেক্ষা করতে থাকেন তাঁর গল্প প্রকাশের।১৯২৪ সালের মার্চে প্রাবাসী পত্রিকায় 'শুধু কেরানী' এবং এপ্রিলে 'গোপনচারিণী' প্রকাশিত হলে প্রেমেন্দ্র মিত্রের আনুষ্ঠানিক সাহিত্যযাত্রা শুরু হয়।একই বছর 'কল্লোল' পত্রিকায় 'সংক্রান্তি' নামক গল্প প্রকাশিত হয়।১৯২৬ সালে তার পাঁক ও ১৯২৮ সালে মিছিল উপন্যাস বের হয়।প্রেমেন্দ্র মিত্রের প্রথম কবিতার বই "প্রথময়" প্রকাশিত হয় ১৯৩২ সালে।বাংলা সাহিত্যে প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রথম নিয়মিত বিজ্ঞান ভিত্তিক সাহিত্য রচনা শুরু করেন ১৯৩০ সাল থেকে।

প্রেমেন্দ্র মিত্র রচিত বিবিধ সাহিত্য 

প্রবাসী পত্রিকায় গল্প প্রকাশের পর প্রেমেন্দ্র মিত্র সারাজীবন নিরবিচ্ছিন্নভাবে লিখেছেন।যদিও মাঝে কিছুদিন অন্যান্য দিকে ঝুঁকেছিলেন।প্রেমেন্দ্র মিত্র ছোটগল্প, উপন্যাস, কবিতা, রম্যরচনা, কল্প-বিজ্ঞান সাহিত্য রচনা করেছেন।

প্রেমেন্দ্র মিত্র রচিত কয়েকটি কবিতার বই হলঃ প্রথমা,সম্রাট, ফেরারী ফৌজ, সাগর থেকে ফেরা, হরিণ চিতা চিল, কখনো মেঘ, আমি কবি কামারের ইত্যাদি।প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য বৈপ্লবিক চেতনাসিক্ত মানবিকতা।

প্রেমেন্দ্র মিত্র রচিত অন্যতম উপন্যাসের বই হলঃ পাঁক, মিছিল, উপনয়ন, আগামীকাল,  কুয়াশা, পথ ভুলে, যখন বাতাসে নেশা, হৃদয় দিয়ে গড়া, জড়ানো মালা, পথের দিশা, পা বাড়ালেই রাস্তা, হানাবাড়ি, মনুদ্বাদশ, সূর্য কাঁদলে সোনা ইত্যাদি।

প্রেমেন্দ্র মিত্র রচিত অন্যতম ছোটগল্পের বই হলঃ পঞ্চসব, বেনামী কদর, পুতুল ও প্রতিমা, মৃত্তিকা, অফুরন্ত, ধুলি ধূসর, মহানগর, জলপায়রা, নানা রঙে বোনা, তেলেনাপোতা আবিষ্কার প্রভৃতি। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ছোট গল্পগুলোতে সমাজের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের সম্পর্কের ভাঙা-গড়ার কাহিনী উঠে এসেছে।যা প্রেমেন্দ্র মিত্রের ছোট গল্প লেখার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য।

কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যে প্রেমেন্দ্র মিত্র 

বাংলা সাহিত্যে প্রথম নিয়মিত কল্পবিজ্ঞান সাহিত্য রচনার কৃতিত্ব প্রেমেন্দ্র মিত্রের।প্রেমেন্দ্র মিত্রের প্রথম প্রকাশিত কল্পবিজ্ঞান রচনা 'পিঁপড়ে পুরাণ'।এটি তৎকালীন রামধনু পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।প্রেমেন্দ্র মিত্রের কল্পবিজ্ঞান ও এ্যাডভেঞ্চার কাহিনির চরিত্র মামাবাবু পাঠক মহলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

প্রেমেন্দ্র মিত্রের কিছু কল্পবিজ্ঞান ছোটগল্প হলঃ কালাপানির অতলে, দুঃস্বপ্নের দ্বীপ, যুদ্ধ কেন থামল, মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী, আকাশের আতঙ্ক, পৃথিবীর শত্রু প্রভৃতি।

প্রেমেন্দ্র মিত্রের কল্পবিজ্ঞান ভিত্তিক বড়গল্প ও উপন্যাস হলঃ পিঁপড়ে পুরাণ, কুহকের দেশে, পাতালে পাঁচ বছর, সূর্য যেখানে নীল ইত্যাদি। লীলা মজুমদার প্রেমেন্দ্র মিত্রের কুহুকের দেশে গ্রন্থটিকে বাংলায় প্রথম সার্থক বিজ্ঞানভিত্তিক কিশোর উপন্যাস বলেছিলেন।




চলচ্চিত্র ও প্রেমেন্দ্র মিত্র 

প্রথম জীবনে প্রেমেন্দ্র মিত্র একটি ফিল্ম কোম্পানির পাবলিসিটি অফিসার হিসেবে কাজ করেছিলেন।এর কিছুদিন পর পরিচালক প্রমথেশ বড়ুয়ার কথায় 'রিক্তা' চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লেখেন। চলচ্চিত্রটি সফলতা লাভ করার ফলে প্রেমেন্দ্র মিত্র চলচ্চিত্রে মনেনিবেশ করেন।প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রায় ১৪টি ফিল্ম পরিচালনা করেছিলেন।সমাধান(১৯৪৩) প্রেমেন্দ্র মিত্র পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র।এছাড়া ময়লা কাগজ, কালো ছায়া, হানাবাড়ি, পথ বেঁধে দিল প্রভৃতি প্রেমেন্দ্র মিত্র পরিচালিত চলচ্চিত্র। তার নিজস্ব ফিল্ম কোম্পানি ছিল- 'মিত্রানী'।অনেক চলচ্চিত্রের গল্প, চিত্রনাট্য ও গানও লিখেছেন প্রেমেন্দ্র মিত্র।কিন্তু সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ থেকে চলচ্চিত্র ছেড়ে দেন।এক সাক্ষাৎকারে প্রেমেন্দ্র মিত্রকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সিনেমায় যখন গেলেনই, আবার ফিরে এলেন কেন? উত্তরে প্রেমেন্দ্র মিত্র বলেছিলেন "ফিরে এলাম বলেই তো আমাকে আবার সাহিত্যে পেলে।"

প্রেমেন্দ্র মিত্রের পুরষ্কার ও সম্মাননা 

বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য প্রেমেন্দ্র মিত্র বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পুরষ্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।সাগর থেকে ফেরা কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯৫৪ সালে প্রেমেন্দ্র মিত্র শরৎ স্মৃতি পুরষ্কার লাভ করেন।১৯৫৬ সালে প্রেমেন্দ্র মিত্র আকাদেমি পুরষ্কার পান।১৯৫৭ সালে আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসবে প্রেমেন্দ্র মিত্র বেলজিয়াম গিয়েছিলেন।১৯৫৮ সালে প্রেমেন্দ্র মিত্র রবীন্দ্র পুরষ্কারে ভূষিত হন।ভারত সরকার কর্তৃক প্রেমেন্দ্র মিত্র পদ্মশ্রী পুরষ্কারে ভূষিত হন। এছাড়া ১৯৭৩ সালে আনন্দ পুরষ্কার, ১৯৭৬ সালে নেহেরু পুরষ্কার, শিশু সাহিত্য দের ভুবনেশ্বরী পদক, ১৯৮১ সালে সাহিত্য পরিষদের হরনাথ ঘোষ পদক এবং ১৯৮৮ সালে রাজীব গান্ধীর হাত থেকে নেয়া দেশিকোত্তম উপাধিসহ বিভিন্ন সম্মাননা ও পুরষ্কারে ভূষিত হন প্রেমেন্দ্র মিত্র।


প্রেমেন্দ্র মিত্রের মৃত্যু 

শেষজীবনে পাকস্থলীর ক্যান্সারে আক্রান্ত হন প্রেমেন্দ্র মিত্র। বেশকিছুদিন এই রোগে ভোগেন।১৯৮৮ সালের ৩রা মে প্রেমেন্দ্র মিত্র শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।



পরিচিতদেরকে জানাতে শেয়ার করুন

0 Comments

দয়া করে নীতিমালা মেনে মন্তব্য করুন ??

অর্ডিনারি আইটি কী?