The DU Speech https://www.duspeech.com/2021/09/uttamkumar.html

মহানায়ক উত্তম কুমার

 মহানায়ক উত্তম

বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক খ্যাত অভিনেতা উত্তম কুমার।উত্তম কুমার একাধারে চলচ্চিত্র অভিনেতা, চিত্রপ্রযোজক, পরিচালক, সঙ্গীত পরিচালক এবং গায়ক ছিলেন।বাংলা চলচ্চিত্র যেন তাঁর কাছে ঋণী। বাংলা চলচ্চিত্রের এই মহানায়কের বর্নিল জীবন সম্পর্কে আজ আমরা জানবো।



উত্তম কুমারের জন্মপরিচয় 

বাংলা চলচ্চিত্রের উজ্জ্বল নক্ষত্র উত্তম কুমার ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের কলকাতার আহিরীটোলায় জন্মগ্রহণ করেন।উত্তম কুমারের প্রকৃত নাম অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়। উত্তম কুমারের পিতার নাম সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায় এবং মাতার নাম চপলা দেবী।উত্তম কুমারের পরিবার ছিল মধ্যবিত্ত।উত্তম কুমারের ছোট ভাই তরুণ কুমার(১৯৩১-২০০৩)।

উত্তম কুমারের শিক্ষা ও কর্মজীবন

কলকাতার সাউথ সুবার্বান স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করেন উত্তম কুমার।পরে গোয়েঙ্কা কলেজে ভর্তি হন।বি.কম পড়েই উত্তম কুমার চাকরি করা শুরু করেন।তাই পরবর্তীতে আর পড়া হয়নি তার।প্রথম জীবনে উত্তম কুমার কলকাতার পোর্ট ট্রাস্টে কেরানির চাকরি করেন।এর মধ্যেই অভিনয়ের জন্যও চেষ্টা করে যান।পরে উত্তম কুমার অভিনয়কেই পেশা হিসেবে বেছে নেন।উত্তম কুমার একজন সফল অভিনেতা, পরিচালক এবং প্রযোজক

ফ্লপমাস্টার থেকে সুপারস্টার উত্তম কুমার

ছোট থেকেই অভিনয়ের প্রতি উত্তম কুমারের আলাদা টান ছিল।উত্তম কুমার চাকরির পাশাপাশি আহিরীটোলায় নিজের একটি থিয়েটার গড়ে তুলেছিলেন।১৯৪৮ সালে দৃষ্টিদান ছবিতে উত্তম কুমার প্রথম কাজ করার সুযোগ পান।ছবিটি ফ্লপ হয়।এরপর ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের মধ্যে কামনা, মর্যাদা, সহযাত্রী, নষ্টনীড় সহ উত্তম কুমারের আরো কিছু ছবি ফ্লপ হয়।এর মধ্যে পেয়ে যান ফ্লপ মাস্টার তকমা।এসময় চলচ্চিত্র জগতের মানুষ তার আড়ালে তাকে ফ্লপ মাস্টার বলে কটুক্তি করত।



 ১৯৫৩ সালে উত্তম কুমার 'সাড়ে চুয়াত্তর ' ছবিতে দুর্দান্ত অভিনয়ের মাধ্যমে এ তকমা হটাতে সক্ষম হন।যদিও এ ছবিতে উত্তম কুমার প্রধান চরিত্রে ছিলেন না।এরপর থেকে উত্তম কুমারকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি।১৯৪৮ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত উত্তম কুমার প্রায় ২১২টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।মোট ৪৬ জন নায়িকার সাথে উত্তম কুমার ছবি করেছেন।উত্তম কুমারের প্রথম নায়িকা ছিল মায়া মুখোপাধ্যায় এবং শেষ ছবিতে নায়িকা ছিল মৌসুমি চট্টোপাধ্যায়।হারানো সুর, সাগরিকা, চাওয়া-পাওয়া, মনের ময়ূর, অগ্নি পরীক্ষা, সাঁঝের প্রদীপ, দেবত্র, হারজিৎ, সুরের পরশে, পৃথিবী আমারে চায়, নেকলেস, ভ্রান্তি-বিলাস, নিশীথে, উত্তরায়ণ, রাজকন্যা, গৃহদাহ, তিন অধ্যায়, নিশিপদ্ম, মেম সাহেব, চিড়িয়াখানা, অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, আমি সে ও সখা, মৌচাক, দেবদাস, দুই পৃথিবী, ওগো বধূ সুন্দরী সহ আরো অনেক জনপ্রিয় ফিল্মে উত্তম কুমারের অভিনয় দর্শক মনে জায়গা করেছিল। সত্যজিৎ রায়ের নায়ক এবং চিড়িয়াখানা ছবিতে অভিনয় করেছিলেন উত্তম কুমার।চিড়িয়াখানা ছবিতে উত্তম কুমারকে ভিন্ন রূপে ব্যোমকেস বক্সীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। দেয়া নেয়া ছবিতে হৃদয়হরণের চরিত্রে অভিনয় করে ভিন্নরূপে দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন উত্তম কুমার। এছাড়া উত্তম কুমার ছোটিসি মুলাকাত, আমার করম আমার ধরম এবং দেশপ্রেমী নামক হিন্দি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছিলেন। প্রথমে রোমান্টিক চরিত্র দ্বারা দর্শক মনে স্থায়ী আসন পেলেও উত্তম কুমার ভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেও সমান দক্ষতা দেখিয়েছেন।



উত্তম কুমার কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী, বনপলাশীর পদাবলী, শুধু একটি বছর চলচ্চিত্রগুলোর পরিচালক ছিলেন।পরিচালক হিসেবেও উত্তম কুমার সফল হয়েছিলেন।

উত্তম কুমারের গানের প্রতি ঝোঁক ছিল আগে থেকেই।চলচ্চিত্রে উত্তম কুমার মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানে ঠোঁট মেলাতেন।উত্তম কুমার 'কাল তুমি আলেয়া' ছবির সবগুলো গানের সুরারোপ করেছিলেন।

 অমর জুটি উত্তম-সুচিত্রা 

উত্তম কুমারের সব ছবি যখন ফ্লপ হচ্ছিল তখন 'সাড়ে চুয়াত্তর ' চলচ্চিত্রে পার্শ্ব অভিনেতা হয়েও সুচিত্রার বিপরীতে রোমান্টিক চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসনীয় হন।বাংলা চলচ্চিত্র পায় দক্ষ ও নিপুণ রোমান্টিক জুটি।১৯৫৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত উত্তম কুমারের ১৪টি ছবির মধ্যে ৭টিই ছিল সুচিত্রা সেনের সাথে।সে বছরই 'ওরা থাকে ওধারে' চলচ্চিত্রটি দিয়ে দর্শক হৃদয়ে স্থান করে নেয় উত্তম-সুচিত্রা জুটি।উত্তম-সুচিত্রা জুটি হয়ে প্রায় ৩১টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।এর মধ্যে হারানো সুর, পথে হল দেরী, সপ্তপদী, চাওয়া-পাওয়া, বিপাশা, জীবনতৃষ্ণা, শাপমোচন, সূর্যতোরণ, রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত, চন্দ্রনাথ, সাগরিকা প্রভৃতি অন্যতম। উত্তম কুমার সুচিত্রা সেনকে রমা বলে ডাকতেন।এক সাক্ষাৎকারে উত্তম কুমার বলেছিলেন, সুচিত্রা পাশে না থাকলে আমি কখনোই উত্তম কুমার হতে পারতাম না।এ আমার বিশ্বাস। আমি উত্তম কুমার হয়েছি কেবল ওর জন্য।


 

ভালোই চলছিল তাদের জুটি।বাংলা চলচ্চিত্রে '৫০ এবং '৬০ এর দশকের ব্যবসায়িকভাবে সফল ও প্রশংসনীয় চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছে উত্তম-সুচিত্রা।কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্রের এই অমর জুটি ১৯৬২ এর পর একসঙ্গে ছবি করা কমিয়ে দেন।তাঁদের জুটি ভাঙার পর উত্তম কুমার অন্যান্য অভিনেত্রীদের সাথে ছবি করেন।আর সুচিত্রা সেনও অন্যদের সাথে অভিনয় করলেও সফল হননি।উত্তম সুচিত্রা ছিল একে অপরের পরিপূরক জুটি।সুচিত্রা ছাড়া উত্তমের ফিল্ম কিংবা উত্তম ছাড়া সুচিত্রার ফিল্ম দর্শক গ্রহনযোগ্য ছিলনা। তবে উত্তম -সুচিত্রা জুটি এখনও বাংলা চলচ্চিত্রের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জুটির আসনে।এই জুটি শিখিয়েছে কিভাবে ভালোবাসতে হয়, কিভাবে প্রেমিকার চোখের দিকে তাকাতে হয়।নিজেদের মেধা,সুনিপুণ অভিনয় দ্বারাই উত্তম-সুচিত্রা অমর জুটি হয়েছিল।


উত্তম কুমারের বৈবাহিক জীবন এবং সঙ্গী



তখনও উত্তম কুমার হয়ে ওঠার স্বপ্ন ধরা দেয়নি অরুণ কুমারকে।কেরানির চাকরি আর থিয়েটার করে কাটছিল দিন।এমন সময়ই গৌরী দেবীর প্রতি অনুরাগ জন্মে উত্তম কুমারের। গৌরী ছিল অভিজাত ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে।উত্তমের জেঠতুতো বোনের সূত্রে গৌরী তাদের বাড়িতে আসত।সেখান থেকেই তাকে পছন্দ করত উত্তম কুমার।গৌরীর স্কুলের সামনে গিয়েও দাড়িয়ে থাকত উত্তম কুমার।একসময় গৌরীর মনেও উত্তমের প্রতি অনুরাগ জন্মে।গৌরী দৃষ্টিদান চলচ্চিত্র দেখার সময় ঠাকুমা তাকে জিজ্ঞেস করেছিল -কোন ছেলেকে পছন্দ। সরল মনেই গৌরী পর্দায় ওঠা উত্তমকে দেখিয়ে দিয়েছিল।একসময় গৌরীর বিয়ে ঠিক হলে সে উত্তমকে বলে বাবার কাছে নিয়ে যায়।পরে প্রবল বাক-বিতন্ডার পর উত্তম-গৌরীর বিয়ে হয় ১৯৪৮ সালের ১লা জুন পামপুকুর ইনস্টিটিউশনে।শুরু হয় তাদের বৈবাহিক জীবন।গৌরী উত্তম কুমারকে বণিক বলে ডাকত আর উত্তম গৌরীকে গজ বলে ডাকত।১৯৫০ সালের ৭ সেপ্টেম্বর তাদের জীবন আলো করে আসে একমাত্র পুত্র গৌতম কুমার।



কিন্তু চলচ্চিত্র জীবনে পাকাপোক্ত স্থান গাড়ার পর উত্তম ও সুচিত্রাকে নিয়ে সন্দেহ বাসা বাঁধে মনে।তাদের সুখের সংসারে বিচ্ছিন্নতা আনতে সন্দেহই যথেষ্ট ছিল। ১৯৬৩ সালে গৌরীর সঙ্গ ছেড়ে ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে থাকা শুরু করেন।প্রায় ১৭ বছর মৃত্যুর আগ-মুহূর্ত পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন উত্তম কুমার।


উত্তম সম্মাননা ও পুরষ্কার

দক্ষ ও সুনিপুন অভিনয় দ্বারা বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উপাধি পেয়েছেন উত্তম কুমার। ১৯৫৭ সালে হারানো সুর ছবিতে অভিনয়ের জন্য উত্তম কুমার রাষ্ট্রপতির 'সার্টিফিকেট অফ মেরিট' পেয়েছিলেন।১৯৬৭ সালে এন্টনি ফিরিঙ্গি ও চিড়িয়াখানা চলচ্চিত্রের জন্য পান জাতীয় পুরষ্কার (তখন এই পুরষ্কারের নাম ছিল ভরত)।এছাড়া কলকাতা মেট্রোর টালিগঞ্জ অঞ্চলের স্টেশনটির নাম রাখা হয়েছে 'মহানায়ক উত্তম কুমার মেট্রো স্টেশন'।

মহানায়কের মৃত্যু 

১৯৮০ সালে 'ওগো বধূ সুন্দরী' চলচ্চিত্রের শ্যুটিং চলাকালে হার্ট অ্যাটাক করেন উত্তম কুমার। কলকাতার বেলভিউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ২৪ জুলাই উত্তম কুমার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।মাত্র ৫৩ বছর বয়সে হাজারো ভক্তকে কাঁদিয়ে পরপারে পাড়ি জমান বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তম কুমার।



পরিচিতদেরকে জানাতে শেয়ার করুন

0 Comments

দয়া করে নীতিমালা মেনে মন্তব্য করুন ??

অর্ডিনারি আইটি কী?