The DU Speech https://www.duspeech.com/2022/08/blog-post.html

চর্যাপদের সমাজচিত্র আলোচনা কর | সামাজিক গুরুত্ব | সমাজজীবন pdf

 চর্যাপদের সমাজচিত্র বা সমাজজীবন অনার্সে বাংলা বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ একটি টপিক। প্রতি বছরই চর্যাপদের সমাজচিত্র বা সমাজজীবন এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে আমার চর্যাপদের সমাজচিত্র নোট আজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর্টিকেল রাইটিং সংগঠন এর ওয়েবসাইটে শেয়ার করছি, আশা করছি সবাই উপকৃত হবে। 




হাজর বছর পূর্বের সমাজ ব্যবস্থার চিত্র আমরা চর্যাপদ থেকে পাই। সাহিত্যের মাধ্যমেই সমাচিত্র প্রতিফলিত হয়। আধুনিক যুগের সাহিত্যে সমাজ যেভাবে প্রতিফলিত হয়, তা প্রাচীন যুগের সাহিত্যে আশা করা যায় না। কেননা  তখন সাহিত্যিকরা সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করত না, তাঁরা রাজা ও দেবতাদের ইতিহাস লিখতো। কিন্তু চর্যাপদ এর সিদ্ধাচার্যগণ চর্যা সাধনার মূল মন্ত্র লোকসমক্ষে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন তাই এগুলিকে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য লৌকিক সমাজের মধ্য থেকে নানাবিধ লৌকিক উপমা ও উদাহরণ সংগ্রহ করেছেন। এভাবে আমরা চর্যাপদ এর মধ্যে সমাজচিত্র দেখতে পাই।

         যদিও প্রাচীন যুগের সাহিত্যে সাধারণ মানুষের বর্ণনা স্থান পেতো না কিন্তু চর্যাপদে একেবারে প্রান্তিক, দরিদ্র ও অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষের এবং সেই সমাজের চিত্র পাওয়া যায়। সেখানে মানুষের তিনবেলা আহারের নিশ্চয়তাই ছিলনা। তৎকালীন সময়ে মানুষ টিলার উপর ঘর তৈরি  করতো এবং প্রতিবেশী ছিলনা এবং প্রচন্ড অভাব অনটন সত্বেও প্রতিনিয়ত অতিথির আনাগোনা চলতো। চর্যার একটি পদে তার চিত্র আমরা দেখি-

'টালত মোর  ঘর নাহি পড়বেশী।

হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী।।'(চর্যা নং -৩৩, ঢেন্ডন পা) 

         আমরা চর্যাপদে যে সমাজের বর্ণনা পাই তা থেকে আমরা তৎকালীন বৌদ্ধ ধর্মের সমাজব্যবস্থা দেখি এবং তৎকালীন সাধারণ মানুষ সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ভাবে অবহেলিত ছিল। ড. মিজান রহমানের মতে-

" চর্যাগীতি তে ইহাদের যে চিত্র পাওয়া যায় তাহা একদিকে যেমন ধর্মক্ষেত্রে ইহাদের      বৌদ্ধত্ব অন্যদিকে আর্থিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে তাহাদের অবহেলিত বিপর্যস্ত অবস্থাই প্রমাণ করে।" (ড. মিজান রহমান, চর্যাপদঃপাঠ ও মূল্যায়ন, প্রথম সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৮০)

  তৎকালীন নিম্ন শ্রেণীর মানুষ নগরজীবনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। তারা বসবাস করত নগর থেকে অনেক দূরে এবং সেই সকল স্থানে তেমন কোন সুবিধা ছিল না।  কবি কাহ্নপা এই চিত্রটি খুব সুন্দর করে তুলে ধরেছেন তার পদে-

    'নগর বাহিরেরে ডোম্বী তোহোরি কুড়িআ।

ছুই ছোই জাইসি ব্রহ্মণ নাড়িআ।।' (চর্যা নং-১০,  কাহ্নপা)


     সিদ্ধাচার্যগণ এর অনেকেই উচ্চ বংশ সম্ভূত এবং রাজপুত্র ও ছিলেন কিন্তু বুদ্ধদেবের মত এরাও তাদের বাণী সাধারণ জনতার কাছে পৌঁছে দিতে সাহিত্য সৃষ্টি করেছিলেন।

তৎকালীন সমাজে প্রধান জীবিকা ছিল কৃষিকাজ তাছাড়া ছিল হরিণ শিকার, মদ তৈরি করা ও বিক্রয় করা। তখন কৃষিকাজের জন্য গোপালন নিত্যনৈমিত্তিক বৃত্তি ছিল। বলদ দিয়ে হাল চাষ করা হতো। গরুর গাড়ি ছিল। গাভী পালন করা হতো দুধের জন্য। তখন নৌকায় করে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন তৈজসপত্র যেমন চাঙারি বিক্রয় করে বেড়াতো যা চর্যার একটি পদে উল্লেখ রয়েছে-

 'হালো ডোম্বী তো পুছমি সদভাবে।

আইসসি জাসি ডোম্বী কাহারি নাবে।।

তান্তি বিকণঅ ডোম্বী আবরণ চাঙ্গেরা।

তোহোর অন্তরে ছাড়ি নড়াপড়া।।' ( চর্যা নং-১০, কাহ্নপা  ) 

উক্ত পদটির অর্থ এমন হয় যে, হ্যাঁ গো ডোম্বী তোমাকে প্রিয় ভাবে জিজ্ঞাসা করি। আসো যাও ডোম্বী কার নৌকায়? তাঁতের দ্রব্য বিক্রয় কর ডোম্বী  বিনা চাঙারিতে। তোমার জন্য ছাড়লাম সংসার নাটক পেটিকা। অন্যদিকে সম্পাদক ড. মিজান রহমান বলে-

" ইহাদের জাতীয় বৃত্তি ছিল মনে হয় তাঁত বোনা এবং চাঙ্গারী প্রস্তুত করা।"(ড. মিজান রহমান, চর্যাপদঃ পাঠ ও মুল্যায়ন পৃষ্ঠা ৮২)

 সেসময়ের একটি জীবন্ত চিত্র তুলে ধরেন শবরপা তার একটি পদে- 

      উষ্ণা উষ্ণা পাবত তঁহি বসই সবরী বালী।

      মোরঙ্গ পীচ্ছ পরহিন সবরী  গীবতগুঞ্জরী মালী।।

       উমত সবরো পাগল শবরো মা কর গুলী গুহাজ তোহোরী।

       ণিঅ ঘরণী নামে সহজ সুন্দারী।।'(চর্যা নং-২৮, শবর পা ) 

    উক্তপদ বিশ্লেষণে আমরা বুঝতে পারি, সুউচ্চ পর্বতমালায় এদের বসবাস ছিল।   সবর পাগল হয়ে গোলমাল করে বেড়াতো তার নিজ ঘরের সুন্দরীর জন্য। নানা শ্রেণীর ফুল পল্লবে মুকুলিত হয়ে গগন পর্যন্ত তাদের ডালগুলো পৌঁছাতো। শবরী একা একা ঘুরে বেড়াতো।  চারিদিকে কৃষিক্ষেত্রে কার্পাস ফুলে ফুলে সাদা হয়ে উঠতো। 


 এবাদত হোসেন উল্লেখ করেছেন-

" বন্ধ হস্তি ধরে পোষ মানান হতো। মাঝেমাঝে খোঁড় বা শিকল ছিড়ে অনর্থ ঘটাত।" (চর্যাপরিচিতি, ২য় সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৩৪)

সে যুগে নারীরা খুব স্বাধীন ছিল বলে অনেকেই ধারণা করেন। তারা স্বেচ্ছায় সঙ্গীও পেশা নির্বাচনের অধিকার রাখতেন। কিন্তু শামসুল আলম সাঈদ এর মতে-

" বৌদ্ধ ধর্মে নারীকে খুব অবহেলিত করা হয়েছে তাদের মার বলা হয়েছে, নারী সকল অনিষ্টের মূল।" (শামসুল আলম সাঈদ, চর্যাপদঃ তাত্ত্বিক সমীক্ষা,  পৃষ্ঠা ২৩৬)

গৃহবধূর ছল করা নিয়ে কুক্কুরীপা বলেন, সে দিনের বেলা কাকের ডাকে ভয় পায় কিন্তু রাত্রিবেলা প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে যায়। সেসময়ের নারীরা নৌকা চালানো ও লোক পারাপার ইত্যাদি কর্মে অংশগ্রহণের উল্লেখ পাওয়া যায়।  এছাড়াও নারীরা গরুর স্থান অধিকার করেছিল। এর মধ্যে অনেক স্ত্রীলোক ছিল তারা নাচ গানের মাধ্যমে দর্শকদের মন জয় করত ও গণিকাবৃত্তি দ্বারা জীবিকা অর্জন করত।  কাহ্নপাদ একটি পদে উল্লেখ করেছেন-

'কাহ্নে গাইতু কাম চন্ডালী।

ডোম্বী তো আগলী নাহি ছিনালী।।' (চর্যা নং-১৮, কাহ্নপা)

 তৎকালে পাটনী প্রথা ছিল এবং ডুমনীরা পাটনীর কাজ করত। কেউ কেউ পারিশ্রমিক না নিয়ে পূন্যের জন্য কাজ করত। দেহকে নৌকা করে ভবনদী পার হওয়ার মন্ত্রনা ও সিদ্ধাচার্যগণ দিয়েছেন। নৌকাযোগে লঙ্কা পর্যন্ত বাণিজ্য চলত পন্যদ্রব্যের মাঝে সোনা-রূপা প্রধান ছিল। ঝড়ে মাঝে মাঝে নৌকাডুবি ও হত। পূণ্যের লোভে ছোট নদী ও খালের ওপর দিয়ে কেউ কেউ সাঁকো তৈরি করে দিত। গাছ ফেঁড়ে তক্তা জুড়ে এই সাঁকো তৈরি করা হতো। চলাচলের রাস্তা খুব একটা প্রশস্ত ছিল না। মাঝে মাঝে ডাকাতেরা নৌকাতে লুট করতো।  এমন একটি আভাস পাওয়া যায় ভুসুকুপা এর একটি পদে-

"বাজ ণাব পাড়ী পঁউআ খাঁলে বাহিউ।

অদঅ দঙ্গালে দেশ লুড়িউ।।' (৪৯ নং, ভুসুকুপা)

 


তৎকালীন সময়ে জাল দিয়ে হরিণ শিকারের কথা চর্যাপদে জানা যায়। হরিণ শিকারকেই শিকার এর মধ্যে প্রাধান্য দেওয়া হত। পুলিন্দ, শবর প্রভৃতি নিম্ন শ্রেণীর মধ্যে হরিণের মাংস অতি প্রিয় ছিল। ভুসুকুপা হরিণ শিকারের উপমা দিয়ে প্রকাশ করেছেন-

'তিণ ন ছুবই হরিণা পিবই ন পাণী।

হরিণা হরিণির নিল আ ণ জাণী।।

হরিণী বোলই হরিণা সুন তো।

এ বন ছাড়ী হোহু ভান্তো।।' (চর্যা নং-৬, ভুসুকুপা,,,,)

    সে সময়ে সমাজে আচার-অনুষ্ঠান পুজো আর্চনাসহ নানাবিধ ক্রিয়াকর্মে উৎসব ও প্রমোদের চিত্র পাওয়া যায়। সেকালেও খুব ধুমধাম করে  বিবাহ উৎসব অনুষ্ঠিত হতো। বাঁশি,  একতারা, পটহ, মদল, করন্ত, কমালা, দুন্দভি, হেরুক প্রভৃতি বাদ্য যন্ত্রের উল্লেখ রয়েছে।

    আমোদ-প্রমোদের জন্য সেখানে দাবা খেলা, পাশা খেলা ও নাচ-গান প্রভৃতির প্রচলন ছিল।  দাবা খেলা সে সময়ে খুবই জনপ্রিয় ছিল। লাউ বাকলের সাথে বাঁশের ভাঁট লাগিয়ে তন্ত্রী যোগে এক প্রকার বাদ্যযন্ত্র তৈরি করা হতো। বীনাপা এর একটি পদে আমরা দেখি-

'সূজ লাউ শসি লাগলী তান্ত্রী।

অনহা দান্ডি চাকি কি অত আবধুতী।।'(চর্যা নং-১৭,বীনাপা)

    বিবাহের পর বর-বধু খাটে শয়ন করে বাসর যাপন করত। কর্পূর দিয়ে পান খেত এসব বর্ণনাও চর্যাপদ এসেছে। কাহ্নপা এর কবিতায় সেসময়কার বাঙালি বিবাহের একটি কথাচিত্র দেখা যায়-

        'ডোম্বী বিবাহিআ অহাবিউ জাম।

জউতুকে কিঅ আনুত্তর ধাম।।'( চর্যা নং- ১৯, কাহ্নপা)


    উপরিউক্ত চর্যাটি পড়ে মনে হয় সেই পুরনো দিনেও বাংলাদেশে বিয়েতে বর পক্ষ বেশ যৌতুক পেতেন। যৌতুকের লোভে বোধ হয় নিচস্থ কুলের কন্যা   গ্রহনেও আপত্তি ছিল না। যৌতুক পেলেই বর মহা খুশি।

    সে সময় রমণীরা কঙ্কণ,  কুন্ডল, হার, নূপুর প্রভৃতি পরিধান করত। শবর জাতির মেয়েরা খোঁপায় ময়ূরের পূচ্ছ,  গলায় গুঞ্জার মালা এবং নানাবিধ পুষ্প-পত্রে দেহ সজ্জিত করত। সন্তান প্রসবের সময় বধুকে আঁতুড়ঘরে যেতে হতো গৃহস্থালির জিনিসপত্রের মধ্যে দর্পণ, কুঠার, তালাচাবি, হাড়ি, পিঠা, ঘড়া,  ঘুডুলী ইত্যাদি।

    তৎকালীন সমাজে তন্ত্র-মন্ত্রের প্রতি বিশ্বাস লোক সমাজে প্রচলিত ছিল। কামরূপ তন্ত্র মন্ত্র এবং যাদুবিদ্যার পীঠস্থান ছিল। এখনো গ্রামাঞ্চলে কামরূপ কামাখ্যার প্রতি বিশ্বাস প্রচলিত আছে। যাদু মন্ত্র বলে ডাকিনী, যোগিনী, কুহকিনী রাত্রিতে কামরূপ যেত বলে জনসাধারণের একটা বিশ্বাস ছিল। চর্যার একটি পদে এমন আভাস আছে-


'দিবসই বহুড়ী কাউহি ডর ভাঅ।

রাতি ভইলে কামরু জাঅ।।'(চর্যা নং -০২,কুক্কুরী পা)

    অন্তজ শ্রেণীর চিত্রই সাধারণত চার্যার সমাজে স্থান পেয়েছে।একদিনে এ সবগুলো চর্যা রচিত হয়নি, দীর্ঘদিনের সাধনা ও প্রবাহমান চিন্তাধারায় এগুলো ভেসে এসেছে। চর্যাকারগণ সমাজের সচেতন শিল্পী ছিলেন কিনা, সেটা বিতর্কের বিষয়। তবে চর্যাপদে অন্তজ শ্রেণীর জীবনযাত্রা সহ সকল শ্রেণীর মানুষের চিত্র উঠে এসেছে। ব্রাহ্মণ্য সমাজের পূজো-আর্চা, ধনীদের জীবন যাত্রার কিছু আভাস, জমিজমা ভোগ দখলের জন্য দলিলপত্র এবং তাম্রশাসনের প্রচলন ছিল। তাঁদের ঘরে সোনা-রুপার ব্যবহার ছিল। সব মিলিয়ে চর্যাকারগণ তত্ত্ব প্রচার করতে গিয়েও যে খন্ড বিচ্ছিন্ন সমাজ চিত্র দান করেছেন, সেগুলো আসলে একত্রে সম্পূর্ণ সমাজব্যবস্থাকে নির্দেশ করে।

    




পরিচিতদেরকে জানাতে শেয়ার করুন

0 Comments

দয়া করে নীতিমালা মেনে মন্তব্য করুন ??

অর্ডিনারি আইটি কী?