The DU Speech https://www.duspeech.com/2021/08/kazinazrulislam.html

কাজী নজরুল ইসলামের আদ্যোপান্ত

  

কাজী নজরুল ইসলামের আদ্যোপান্ত

সৃষ্টিশীল প্রেরণায় উদ্ভাসিত এক উজ্জ্বল নাম কাজী নজরুল ইসলাম।বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা নজরুলের ঝুলিতে।নজরুলের জীবন ছিল বর্নিল এবং বিচিত্র অভিজ্ঞতায় ভরপুর।জীবনকে নজরুল দেখেছে নানা আঙ্গিকে।কখনো তার জীবনে ছিল দুঃখ কখনো বা ব্যাপক আনন্দ। আজ জাতীয় কবির প্রয়াণ দিবসে সংক্ষিপ্ত পরিসরে তাঁর জীবনের আদ্যোপান্ত জানার চেষ্টা করবো আমরা।



সংবাদ সূচীপত্র 

✪নজরুলের জন্মপরিচয় 

✪কাজী নজরুলের পড়াশোনা 

✪নজরুলের কর্মজীবন 

✪নজরুলের সাহিত্যে পদচারণ 

✪কবি নজরুল 

✪বিদ্রোহী কবি নজরুল 

✪নজরুল রচিত জীবনি কাব্য

✪নজরুল রচিত উপন্যাস 

✪নজরুল রচিত প্রবন্ধ 

✪নজরুল রচিত গল্প গ্রন্থ 

✪নজরুল রচিত নাটক

✪নজরুলের নিষিদ্ধকৃত গ্রন্থ

✪সঙ্গীতে নজরুল 

✪ছায়াছবি এবং নজরুল 

✪নজরুলের আলোচিত প্রেম

✪প্রেমের কবি নজরুল

✪ নজরুলের সাংসারিক জীবন ও সঙ্গী

✪নজরুলের রাজনৈতিক জীবন 

✪নজরুলের বাংলাদেশে আগমন

✪নজরুল এবং সাহিত্য ভাতা

✪রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় নজরুলের বাংলাদেশে আগমন 

✪নজরুলের সম্মাননা

✪বিশ্বকবির সাথে নজরুলের সম্পর্ক 

✪নজরুলের মৃত্যু 



নজরুলের জন্মপরিচয় 

বাংলা সাহিত্যে বহুমাত্রিক প্রতিভাধর এবং অবিস্মরণীয় প্রতিভায় উদ্ভাসিত নাম কাজী নজরুল ইসলাম।কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ১৮৯৯ সালের ২৪ মে, বাংলা ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে।কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম বাঙালি মুসলমান কাজী পরিবারে। কাজী নজরুলের পিতার নাম কাজী ফকির আহমদ এবং মাতার নাম জাহেদা খাতুন।কাজী ফকির আহমদ তাদের গ্রামেরই পিরপুকুর মসজিদের ইমাম ও মাজারের খাদেম ছিলেন। কাজী নজরুলের ডাকনাম ছিল দুখু মিয়া।


কাজী নজরুলের পড়াশোনা 

কাজী নজরুল ইসলাম গ্রামের মকতব থেকে নিম্ন প্রাথমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। ১৯১০ সালে নজরুল পুণরায় ছাত্রজীবন শুরু করেন।প্রথমে নজরুল রানীগঞ্জ শিয়ারসোল রাজ স্কুল এবং পরে মাথরুন উচ্চ ইংরেজি স্কুলে ভর্তি হন।আর্থিক অনটনের কারণে ৬ষ্ঠ শ্রেণির পর নজরুলের ছাত্রজীবনে ব্যাঘাত ঘটে। এরপর দারোগা রফিজউল্লাহর ভাই সাখাওয়াত উল্লাহ নজরুলকে দরিরামপুর স্কুলে ১৯১৪ সালে ৭ম শ্রেণিতে ভর্তি করেন।স্কুলে নজরুল ফ্রী স্টুডেন্টশিপ পেয়েছিলেন।নজরুল ক্লাসে অন্যমনস্ক থাকলেও পরীক্ষার আগে ধার করে আনা বই পড়ে প্রথম বা দ্বিতীয় হতেন। সেখানেই নজরুল ৭ম শ্রেণী পাস করেন।এরপর ১৯১৫ সালে নজরুল পশ্চিমবঙ্গের রানিগঞ্জ শিয়ারশোল রাজ স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন।এই স্কুল থেকে ১৯১৭ সালে দশম শ্রেণির প্রি-টেস্ট পরীক্ষার সময় লেখাপড়া অসমাপ্ত রেখে নজরুল সেনাবাহিনিতে যোগ দেন।


নজরুলের কর্মজীবন 

১৯০৮ সালে কাজী নজরুলের পিতা মারা যান।পরিবারের অভাব-অনটনের জন্য নজরুল নিজেই কাজ শুরু করেন।তখন নজরুলের বয়স মাত্র ৯ বছর।প্রথম জীবনেই নজরুল  মাজারের খাদেম ও মসজিদের ইমাম ছিলেন। এসময় নজরুল মক্তবের শিক্ষক রূপেও দায়িত্ব পালন করেছেন।১২   বছর বয়সে নজরুল লোকনাট্য লেটো দলে যোগ দেন।সেখানে নজরুল পালাকার ও অভিনেতা ছিলেন। এরপর নজরুল আসানসোলে রুটির দোকানে কাজ শুরু করেন।সেখানে নজরুলের সাথে দেখা হয় দারোগা রফিজউল্লাহ'র।নজরুলের করুণ কাহিনি শুনে রফিজউল্লাহ এবং তার স্ত্রী সামসুন নেসা মাসিক পাঁচ টাকা বেতনে নজরুলকে গৃহ ভৃত্য হিসেবে রাখেন।সেখানে নজরুল তিন মাস ছিলেন।এরপর ১৯১৭ সালে নজরুল ৪৯ নং বাঙালি পল্টনে সেনাবাহিনিতে যোগ দেন।১৯১৭ সালের শেষ থেকে ১৯২০ সালের মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় আড়াই বছর নজরুলের সামরিক জীবনের পরিধি।এসময় নজরুল ৪৯ বেঙ্গলি রেজিমেন্টের একজন সাধারণ সৈনিক থেকে ব্যাটেলিয়ন কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পর্যন্ত পদোন্নতি হয়েছিল।সেনাবাহিনী থেকে আসার পর নজরুল ১৯২০ সালে নবযুগ পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন।১৯২২ সালে নজরুলের সম্পাদনায় অর্ধ সাপ্তাহিক পত্রিকা 'ধূমকেতু' বের হয়।নজরুলের সম্পাদনায় 'লাঙ্গল' পত্রিকা প্রকাশ হয় ১৯২৫ সালে।এরপর নজরুল তার বাকি জীবন পেশা হিসেবে লেখনিকেই বেছে নেন।




নজরুলের সাহিত্যে পদচারণ 

নজরুল ১২ বছর বয়সে কবিতা,গান ও নৃত্যের মিশ্র আঙ্গিক লোকনাট্য লেটোদলে যোগদান করে।লেটো দলে নজরুল পালাগান রচনা এবং অভিনয় করত।নজরুলের কবি ও শিল্পী জীবনের শুরু এখানেই।তাৎক্ষণিক গান ও কবিতা রচনার কৌশল নজরুল এখান থেকেই আয়ত্ত করেন।লেটো দলে থাকাকালীন নজরুল রচনা করেন- চাষার সঙ,শকুনি বধ,দাতা কর্ণ,কবি কালিদাস প্রভৃতি।এরপর নজরুলের সাহিত্যচর্চা নিরবিচ্ছিন্ন চলে।কুমিল্লা থাকাকালীন নজরুল দরিরামপুর স্কুলের বিচিত্রানুষ্ঠানে কোন প্রস্তুতি ছাড়াই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'দুই বিঘা জমি' ও 'পুরাতন ভৃত্য' কবিতা দুটি আবৃত্তি করেন।ক্লাসে অমনোযোগী থাকলেও স্কুলের নাটক,বিতর্ক, আবৃত্তি ও রচনা প্রতিযোগিতায় সবসময় অংশ নিতেন নজরুল। নজরুলের আনুষ্ঠানিক সাহিত্য চর্চা শুরু হয় সৈনিক জীবনে।করাচি সেনানিবাসে থাকাকালীন নজরুল বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করেন।এখানেই নজরুল ১৯১৯ সালের মে মাসে প্রকাশ করেন তার প্রথম গদ্য রচনা 'বাউন্ডুলের আত্মকাহিনী'।নজরুলের প্রথম কবিতা 'মুক্তি' একই বছরের জুলাই প্রকাশিত হয়।এসময় 'হেনা','ব্যথার দান'(তার প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ), 'মেহের নেগার', 'ঘুমের ঘোরে' প্রভৃতি গল্পও প্রকাশিত হয়।এরপর নজরুল তার পুরো জীবনে বিবিধ প্রকার রচনা প্রকাশ করেছেন।


কবি নজরুল 

রবীন্দ্র যুগের কবি হয়েও সম্পূর্ণ স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে কবিতা লেখার কৃতিত্ব কাজী নজরুল ইসলামের।সৈনিক জীবনে নজরুলের কবি প্রতিভার বিকাশ ঘটে।নজরুলের প্রথম প্রকাশিত কাব্য 'মুক্তি'(১৯১৯) এবং প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ অগ্নিবীণা(১৯২২)।অগ্নিবীণা উৎসর্গ করা হয় বিপ্লবী বারীন্দ্র কুমার ঘোষকে।এই গ্রন্থের প্রথম কবিতা প্রলয়োল্লা।বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত নজরুলের কাব্য গ্রন্থের নামঃ 'অগ্নিবীণা', 'দোলনচাঁপা', 'বিষের বাঁশি', 'ভাঙার গান','প্রলয় শিখা', 'ছায়ানট', 'পূবের হাওয়া', 'সাম্যবাদী', 'চিত্তনামা', 'সর্বহারা', ' ফণিমনসা', 'সিন্ধু হিন্দোল', 'ঝিঙেফুল', 'সাত ভাই চম্পা', 'জিঞ্জীর', 'চক্রবাক', 'সন্ধ্যা', 'নতুন চাঁদ', 'মরু ভাস্কর' ইত্যাদি।

নজরুল তার কাব্যের মাধ্যমে মানবের মঙ্গলসাধনের চেষ্টা করেছেন।অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে নজরুল বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন কবিতার ভাষায়।এক সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন পূরণে নজরুল কবিতার মাধ্যমে সাধনা করেছেন।


বিদ্রোহী কবি নজরুল 

নজরুল দেশপ্রেমের পাশাপাশি সকল প্রকার শোষনের বিরুদ্ধে লেখনী ধারণ করেছিলেন।নজরুলের আবির্ভাবে বাংলা সাহিত্যে প্রথম প্রবল প্রতিবাদের সুর ধ্বনিত হয়। 'অগ্নিবীণা', 'সর্বহারা', 'প্রলয়শিখা', 'ফণিমনসা' কাব্য গ্রন্থগুলোতে নজরুল শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন।এজন্যই নজরুলকে বাংলা কাব্য সাহিত্যে 'বিদ্রোহী' কবি বলা হয়।তবে নজরুলের "অগ্নিবীণা" কাব্যের বিদ্রোহী কবিতাটিও তাকে এ পরিচয় দানে প্রাথমিক ভূমিকা রেখেছে।প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর অবক্ষয় ও স্বাধিকার আন্দোলনের পটভূমিতে কাব্যটি রচনা করেন নজরুল।কবিতাটির প্রথম কয়েক চরণ

                           বল বীর--

              বল উন্নত মম শীর

     শির নেহারি আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির!

                          বল বীর--

     বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি'

           চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি'

           ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া,

           খোদার আসন 'আরশ' ছেদিয়া

           উঠিয়াছিল চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাত্রীর।

সাপ্তাহিক বিজলী পত্রিকায় কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়।এটি অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থের অন্যতম ও জনপ্রিয় কবিতা নজরুল চিরকালই তার লেখার মাধ্যমে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন আর অসত্যের প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করেছেন।নজরুলের লেখায় যে বলিষ্ঠ মনোভাব পরিদৃষ্ট হয় তা অন্যকারো লেখায় দেখা যায়নি।



নজরুল রচিত জীবনি কাব্য

কাজী নজরুল ইসলাম দুটি জীবনি কাব্য লিখেছেন।জীবনি কাব্যগুলো হলঃ 'চিত্তনামা'(১৯২৫), 'মরু ভাস্কর'(১৯৫০)। চিত্তনামা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের জীবনি নিয়ে রচিত।নজরুল চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী বাসন্তী দেবিকে মা বলে ডাকতেন।এই গ্রন্থের কবিতাগুলোতে চিত্তরঞ্জনের প্রতি নজরুলের আবেগ মিশ্রিত শ্রদ্ধা প্রকাশিত হয়েছে।অপরদিকে 'মরু ভাস্কর' সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হযরত মুহাম্মদ (স.)এর জীবনি।এই গ্রন্থ চার সর্গে বিভক্ত এবং এতে ১৮টি খন্ড কবিতা রয়েছে।


নজরুল রচিত উপন্যাস 

নজরুলের উপন্যাসে স্বীয় বিশিষ্টতা রয়েছে।নজরুলের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাসের নাম 'বাঁধন হারা'। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয় এটি।নজরুলের এই গ্রন্থটি পত্রোপন্যাসের পর্যায়ভুক্ত।এটিকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম পত্রোপন্যাস বলা হয়।'বাঁধন হারা'(১৯২৭), 'মৃত্যু-ক্ষুধা'(১৯৩০), 'কুহেলিকা' (১৯৩১)।মৃত্যু ক্ষুধা উপন্যাসে নারীজীবনের দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা এবং সমাজের বাস্তবচিত্র প্রকাশ পেয়েছে।


নজরুল রচিত প্রবন্ধ 

কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধের নাম তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা।নজরুলের প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধ গ্রন্থ যুগবাণী। এটি ১৯২২ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত হয়।প্রকাশের প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সরকার বইটি নিষিদ্ধ করে।১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে বইটি থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়া হয়।


নজরুল রচিত গল্প গ্রন্থ 

 কাজী নজরুল ইসলাম কিছু গল্প গ্রন্থও প্রকাশ করেছেন।নজরুলের বিখ্যাত কিছু গল্প গ্রন্থের নাম 'ব্যথার দান'(১৯২২) ,'রিক্তের বেদন'(১৯২৫),'শিউলিমালা'(১৯৩১)।ব্যথার দান নজরুলের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ এবং প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ।এটি ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হয়।


নজরুল রচিত নাটক

কাজী নজরুল নাটক রচনা করেও প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন।আলেয়া, মধুমালা, ঝিলিমিলি নজরুলের নাট্যসৃষ্টি।নজরুল কৈশোরেই গ্রাম্য যাত্রাদলের সংস্পর্শে এসে নাট্য রচনায় আগ্রহী হন।মধুমালা নজরুল রচিত গীতিনাট্য।এই নাটকের ভাষা সঙ্গীতধর্মী এবং আবেগপ্রধান।


নজরুলের নিষিদ্ধকৃত গ্রন্থ 

নজরুলের প্রথম নিষিদ্ধকৃত গ্রন্থ ছিল "বিষের বাঁশি"। এটি প্রকাশিত হয় ১৯২৪ সালের আগস্টে এবং নিষিদ্ধ হয় একই বছরের অক্টোবরে।নজরুল রচিত মোট পাঁচটি গ্রন্থ নিষিদ্ধ হয়। গ্রন্থ গুলো হলঃ বিষের বাঁশি,ভাঙার গান, প্রলয় শিখা, চন্দ্রবিন্দু এবং যুগবানী।বইটিতে লিখিত প্রবন্ধ গুলোর বিষয়বস্তু ছিল স্বদেশী চিন্তাচেতনা ও ব্রিটিশ বিরোধিতা।যুগবানী বইটি প্রায় প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ১৯২২ সালের নভেম্বরে নিষিদ্ধ হয়।১৯৪৭ সালে এটির নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। 

সঙ্গীতে নজরুল 

শৈশবে লেটো দলে থাকাকালীন নজরুলের শিল্পী জীবনের শুরু।এখানেই নজরুল তাৎক্ষণিক গান রচনার কৌশল আয়ত্ত করেন।নজরুলের সঙ্গীত বিষয়ক গ্রন্থ হলঃ চোখের চাতক, নজরুল গীতিকা, সুর সাকী, বনগীতি প্রভৃতি।নজরুল তার গানে মিশ্র ঐতিহ্যের পরিচর্যা করেছেন।নজরুল সঙ্গীতের প্রায় সবকটি ধারায় বিচরণ করেছেন।বাংলা গানকে উত্তর ভারতীয় রাগ সঙ্গীতের দৃঢ় ভিত্তির ওপর স্থাপন করেছে নজরুল।এছাড়া নজরুল লোক-সঙ্গীতাশ্রয়ী বাংলা গানকে উপ-মহাদেশের বৃহত্তর মার্গ সঙ্গীতের সাথে যুক্ত করেছেন।নজরুল সঙ্গীতকে উত্তর ভারতীয় রাগ-সঙ্গীতের বঙ্গীয় সংস্করণ ও বলা যায়।বানী ও সুরের মূর্ছনায় বাংলা সঙ্গীতকে আধুনিক সঙ্গীতে রূপান্তর করেছে নজরুল।নজরুলের গানে আছে যেমন রাগভিত্তিক সুর,সুরের ভেতর কারুকাজ,তেমনি আছে চটুল সুর,আছে গজলের নবীনত্ব ও চমৎকারিত্ব,আছে লোকসঙ্গীতের নানা উপাদান।নজরুল তার সৈনিক জীবনেও সঙ্গীতানুরাগী সহ সৈনিকদের সাথে দেশি-বিদেশি বাদ্যযন্ত্র সহযোগে সঙ্গীত চর্চা করতেন।নজরুল বাংলাদেশের রণসঙ্গীতের রচয়িতা।নজরুলের সন্ধ্যা কাব্যগ্রন্থে রণসঙ্গীতটি অন্তর্ভুক্ত আছে।'নতুনের গান' শিরোনামে এটি প্রকাশিত হলেও পরে এর নাম হয় 'চল্ চল্ চল্'।নজরুলের গান লেখার সূত্রপাত লেটো দলে হলেও সৈনিক জীবন এবং পরেও গান লিখেছেন।১৯২১ সালে মূলত নজরুল গান লেখা শুরু করেন।সেসময় উদ্দীপনামূলক গান লিখলেও কিছু প্রেমের গানও লেখেন নার্গিস ও প্রমিলাকে নিয়ে।১৯২৫ সালে প্রথম নজরুলের গান রেকর্ড হয়।

নজরুল ইসলামী ঐতিহ্য ভিত্তিক ইসলামী গান যেমন সৃষ্টি করেছেন তেমন কীর্তন, কালী, শিব, হিন্দু-পুরাণ ও ঐতিহ্যকপ নিয়েও লিখেছেন।নজরুলের গানে প্রেম বিরহ ছিল প্রধান বিষয়।সুরের জাদুভরা প্রায় তিন হাজারের অধিক গান নজরুল লিখেছেন।দরিরামপুরে অবস্থান কালে নজরুল বাঁশি বাজাতেন।আবার সৈনিক জীবনেও নজরুল গানের পাশাপাশি বাঁশি বাজাতেন।



ছায়াছবি এবং নজরুল 

১৯৩১ সালে পাইওনিয়ার ফিল্ম কোম্পানিতে যোগদানের মাধ্যমে নজরুল ছায়াছবির সাথে সংযুক্ত হন।জানা যায় দশের বেশি ছায়াছবির সঙ্গে নজরুল কাজ করেছেন।এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলঃ বাংলাঃ ধ্রুব, পাতালপুরী, গ্রহের ফের, বিদ্যাপতি, গোরা,চৌরঙ্গী, দিকশূল; হিন্দিঃ বিদ্যাপতি, সাপেড়া ইত্যাদি।ধ্রুব ছবিতে নজরুল একাধারে ছায়াছবির পরিচালক,সঙ্গীত পরিচালক এবং অভিনেতা ছিলেন। উল্লেখিত বেশিরভাগ ছায়াছবিতেই নজরুল সঙ্গীত রচনা,সুরারোপ এবং পরিচালনা করেছেন।


নজরুলের আলোচিত 'প্রেম'

নজরুলের জীবনে প্রেমের ব্যাপারটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং বিশেষভাবে আলোচিত।নজরুলের প্রেম তার সৃষ্টির উৎস।নজরুলের রচনার অন্যতম প্রধান উৎস তার প্রেম,ভালোবাসা এবং বন্ধুত্ব।বিভিন্ন সময়ে নজরুল যাদের প্রেমে পড়েন খোজ নিয়ে জানা যায় তারা সংখ্যায় ৭ জন।এই ৭ জনের মধ্যে ৬ জনের বাড়ি বাংলাদেশে এবং একজনের বাড়ি পশ্চিমবঙ্গে।বাংলাদেশে সবচেয়ে আলোচিত এবং প্রকাশিত হয়েছে নার্গিস, প্রমীলা এবং ফজিলাতুননেছার নাম।নার্গিস ও প্রমীলা ছিল কুমিল্লার সেখানেই নজরুলের সাথে তাদের ভালোলাগার সম্পর্ক তৈরি হয়।ফজিলাতুননেছা টাঙ্গাইলের মেয়ে তবে তার সাথে পরিচয় হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে।এছাড়াও প্রতিভা বসু বা রানু সোম এবং উমা মৈত্র ছিলেন ঢাকার। শামসুননাহার ছিলেন চট্টগ্রামের এবং স্বর্ণলতা গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়ি ছিল খুলনায়।স্বর্ণলতার বাবা ছিল পুলিশ কর্মকর্তা তার সাথে নজরুলের প্রথম দেখা হয় রানীগঞ্জের জগন্নাথ গার্ডেনে।তখন থেকে তার প্রতি নজরুল দূর্বল হয়ে পড়েন।জাহানারা বেগম চৌধুরীই একমাত্র বাংলাদেশের বাইরে পশ্চিমবঙ্গের মালদহে ছিলেন। নজরুলের সৃষ্টির অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র ও উৎস নজরুলের নায়িকারা।



প্রেমের কবি নজরুল 

নজরুলের প্রথম যৌবনের প্রেম স্বর্ণলতা।নজরুলের প্রথম গ্রন্থ ব্যথার দান উৎসর্গ করেছিলেন এই মানসীকে।এছাড়া রিক্তের বেদন ও বাঁধন হারা তে যে প্রেমের আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে তাতে স্বর্ণলতা গঙ্গোপাধ্যায়ের ছায়া দেখা যায়।১৯২০ সালে নজরুলের বরিশালে বেড়াতে যাওয়ার পর তার রচিত ৪টি গানের মধ্যে পথের স্মৃতি এবং দূরের বন্ধুতে স্বর্ণলতার সন্ধানই পাওয়া যায়।পথের স্মৃতিতে নজরুল বলেছেন 

              'পথিক ওগো, চলতে পথে

               তোমায় আমার পথের দেখা

                ঐ দেখাতেই দুইটি হিয়ায়

                 জাগল প্রেমের গভীর রেখা'

এরপর আর কোন লেখাতে স্বর্ণলতাকে পাওয়া যায়নি।


এরপর  নজরুলের আগমন হয় ১৯২১ সালে কুমিল্লায়।২২ বছরের যুবক নজরুল গ্রামের ষোড়শী যুবতী সৈয়দা খাতুনের প্রেমে পড়েন।নজরুল তার নাম পাল্টে রাখেন নার্গিস আসার খানম।নজরুলের ব্যাপক সৃষ্টির সূচনা হয় নার্গিসের সাথে সম্পর্ক থাকাকালীন।'মানস বধূ' কবিতায় যেন নজরুল নার্গিসের বর্ননাই দিয়েছেন এভাবে

    'ছাঁচি পানের কচি পাতা প্রজাপতির ডানার ছোঁয়ায়

  ঠোঁট দুটি তার কাঁপন আকুল একটি চুমায় অমনি নোয়ায়।।

   জল-ছল-ছল উড়ু-উড়ু চঞ্চল তার আখিঁর তারা,

   কখন বুঝি দেবে ফাঁকি সুদূর পথিক পাখির পারা,

   নিবিড় নয়ন পাতার কোলে,

   গভীর ব্যথার ছায়া দোলে।'

নার্গিসকে নিয়ে নজরুল প্রেম ভালোবাসার কবিতার পাশাপাশি গানও লিখেছেন।নার্গিসের সাথে নজরুলের প্রেম বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।প্রেম বিয়ে পর্যন্ত গড়ালেও বিয়ের রাতেই নজরুল কুমিল্লা ছেড়ে চলে আসেন।পরে আর ওমুখো হননি।দীর্ঘদিন পর্যন্ত নজরুল নার্গিসকে নিয়ে লিখেছেন, নার্গিসও নজরুলের জন্য ১৬ বছর অপেক্ষার পর কবি আজীজুল হাকিমকে বিয়ে করে সংসারী হন। 'দোলন চাঁপা','ছায়ানট','পূবের হাওয়া','চক্রবাক' কাব্যগ্রন্থে নজরুল নার্গিসের প্রতি তার অনুভূতি প্রকাশ করেছেন।নিশীথ প্রীতম কবিতায় কবি বলেছেন

              'হে মোর প্রিয়,

              হে মোর নিশীথ রাতের গোপন সাথী।          মোদের    দুইজনারই জনম ভ'রে কাঁদতে হবে গো-

শুধু        এমনি করে সুদূর থেকে একলা জেগে রাতি।।

মোরা     কে যে কত ভালোবাসি কোনদিনই হবে না তা বলা।'

এরপর নজরুলের জীবনে আসেন দোলন।তার জন্যই রচনা করেন দোলন চাঁপা,এতে দোলনের বিজয় প্রকাশিত হয়েছে।নজরুল দোলনকে নানা রূপে নানা ভাবে চিত্রিত করেছেন।কবি যখন প্রায় নিশ্চিত প্রমীলাই হবে তার জীবন সাথী তখনকার 'চপল সাথী' কবিতায় নজরুলের স্থিতির আকাঙ্খা প্রকাশ পেয়েছে এভাবে

 ' প্রিয়!    সামলে ফেলে চ'লো এবার চপল তোমার চরণ!

   তোমার   ঐ চলাতে জড়িয়ে আছে আমার জীবন-মরণ।।

এভাবে প্রমীলা বা দুলি অনেকবার নজরুলের কবিতায় নতুন ভাবে নতুন অনুভূতিতে ধরা পরেছেন। 

নার্গিস এবং প্রমীলার বাইরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদুষী ছাত্রী ফজিলাতুন্নেছা জোহার সাথে নজরুল বেশি আলোচিত হয়েছেন।তিনি অংকের ছাত্রী ছিলেন।১৯২৮ সালে ঢাকার মুসলিম সাহিত্য সমাজের অনুষ্ঠানে ফজিলাতুন্নেছার সাথে নজরুলের দেখা হয়।নজরুল ফজিলাতুন্নেছার প্রতি তার অনুভূতি প্রকাশ করেছেন চিঠি লিখে।এই চিঠিগুলো নজরুলের পত্র সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত।'তুমি মোরে ভুলিয়াছই' কবিতাটি নজরুল ফজিলাতুন্নেছাকে নিয়েই লিখেছেন 

             'তুমি মোরে ভুলিয়াছ তাই সত্য হোক!--

             সেদিন যে জ্বলেছিল দীপালী--আলোক

             তোমার দেউল জুড়ি-ভুল তাহা ভুল!

ফজিলাতুন্নেছা যখন বিলাত চলে যান তখন নজরুল কিছু ব্যর্থ প্রেম ও বিরহের গান লেখেন।'তুমি মোরে ভুলিয়াছ' ছাড়াও 'চক্রবাক' গ্রন্থের 'বর্ষা-বিদায়' ও 'এ মোর অহঙ্কার' ফজিলাতুন্নেছাকে নিয়ে রচিত।এর মধ্যে 'বর্ষা-বিদায়' ফজিলাতুন্নেছার বিলেত যাবার প্রাক্কালে রচিত।এ কবিতার কয়েকটি চরণ হল

        'তুমি চলে যাবে দূরে,

        ভাদরের নদী দুকূল ছাপায়ে কাঁদে ছলছল সুরে।

        যাবে যবে দূর হিম-গিরি-শিরে, ওগো বাদলের পরী

        ব্যথা করে বুকে উঠিবেনা কভু সেথা কাহারেও স্মরি?' 

ঢাকায় প্রতিভা সোম ও উমা মৈত্রের সাথে পরিচয় হয় নজরুলের।প্রতিভা সোমকে নজরুল গান শিখিয়েছিলেন।নজরুলের উৎসাহ ও চেষ্টায় তার গানের রেকর্ড বেরিয়েছিল। উমা মৈত্র অরফে নোটনের সাথে নজরুলের পরিচয় হলে নজরুল প্রায়ই তার বাড়ি যেত।উমা মৈত্র ছিল আধুনিক ভাবধারার।উমা সেতার ও পিয়ানো বাজাতেন নজরুলের গানের সাথে।নজরুল তাকে স্বরচিত গান শেখাত।উমার ব্যাপারে বেশিকিছু জানা যায়নি।চক্রবাক কাব্যগ্রন্থটি উমার পিতা সুরেন্দ্রনাথ মৈত্রকে উৎসর্গ করা হয়েছে।

হাবীবুল্লাহ বাহার ছিল নজরুলের পরিচিত।তার ছোটবোন হিসেবে চট্টগ্রামের শামসুন নাহারের সাথে নজরুলের পরিচয় হয়।১৯২৬ সালে যখন নজরুল চট্টগ্রামে যায় তখন থেকেই হয়ত শামসুন নাহারের সাথে অনুরাগের সম্পর্ক গড়ে উঠে।এরপর নজরুল তাকে নিয়েও কবিতা লেখেন।সিন্ধু হিন্দোল কাব্যে প্রকাশিত 'গোপন প্রিয়া' কবিতাটির গোপন প্রিয়া শামসুন নাহারকে মনে করা হয়।এর কয়েকটি চরণ হল

       'পাইনি ব'লে আজো তোমায় বাসছি ভালো রানি!

       মধ্যে সাগর, এপার ও-পার করছে কানাকানি।

       আমি এ-পার, তুমি ও পার,

       মধ্যে কাঁদে বাধার পাথার,

       ও- পার হতে ছায়া-তরু দাও তুমি হাতছানি,

       আমি মরু, পাইনে তোমার ছায়ায় ছোঁওয়াখানি।

'অ-নামিকা' কবিতাও শামসুন নাহারকে নিয়ে লেখা।এরপর শামসুন নাহারের বিয়ে হয়ে গেলে নজরুল তাকে নিয়ে বিরহের কবিতাও লিখেছেন।


নজরুলের সাংসারিক জীবন ও সঙ্গী

১৯২৪ খ্রিস্টাব্দের ২৪ এপ্রিল আশালতা সেনগুপ্ত অরফে দুলি সাথে নজরুল বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হন।আশালতা সেনগুপ্তকে আদর করে দোলন বা দুলু বলে ডাকা হত।বিয়ের পর নজরুল ভালোবেস নাম রাখেন প্রমীলা।প্রমীলার সান্নিধ্য ও ভালোবাসায় কবি সৃষ্টিকর্মে উৎসাহিত হন।বিয়ের ১৭ মাস পর নজরুলের প্রথম সন্তান জন্মগ্রহণ করে।তার নাম রাখা হয় কৃষ্ণ মোহাম্মদ। কৃষ্ণ মোহাম্মদ ৪মাস বয়সে মারা যায়।এরপর নজরুলের দ্বিতীয় সন্তান বুলবুল ১৯২৯ সালে মারা যায়।এতে প্রমীলা মর্মাহত হন।পরে নজরুলের দুই সন্তান অনিরুদ্ধ ও সব্যসাচী বেচে ছিল।একসময় প্রমীলা পক্ষাগাত গ্রস্থ হন এবং ১৯৬২ সালের ৩০ জুন মৃত্যুবরণ করেন।তাকে চুরুলিয়ায় নজরুলের গ্রামে সমাধিস্থ করা হয়।



নজরুলের রাজনৈতিক জীবন

১৯২১ সালে নজরুল কুমিল্লা আসেন।সেসময় কুমিল্লায় অসহযোগ আন্দোলন চলছিল।নজরুল সেই শোভাযাত্রা এবং সভায় যোগ দেন।এসময় নজরুল নিজের সুরারোপিত স্বদেশী গান যোগে রাজনৈতিক কর্মীতে পরিণত হন।১৯২১ থেকে ১৯২২ সালের মধ্যে নজরুল প্রায় ৮টি রাজনৈতিক গান রচনা করেন।এরপর নজরুল গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলন এবং খিলাফত আন্দোলনেও যোগ দেন।রাষ্ট্রীয় ধ্যান-ধারণায় নজরুল সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছিল মোস্তফা কামাল পাশার নেতৃত্ব দ্বারা।কারণ তিনি ধর্ম নিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন।নজরুল প্রকাশিত ধূমকেতু পত্রিকা ছিল সশস্ত্র বিপ্লবীদের মুখপত্র রূপে।এরপর নজরুলের বিভিন্ন রচনা সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হয় এবং নজরুলকে আটক করা হয়।নজরুল প্রায় এক বছর রাজবন্দী রূপে সাজা ভোগ করেন।নজরুল জেলে থাকাকালীন তাঁর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি লিখিতভাবে আদালতে মাত্র চার পৃষ্ঠার বক্তব্য উপস্থাপন করেন।এই চার পৃষ্ঠার বক্তব্যকেই "রাজবন্দীর জবানবন্দি" বলা হয়।

১৯২৫ সালে নজরুল প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে যোগদান করেন।কাজী নজরুল ইসলাম ওই বছর ফরিদপুর কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে যোগ দেন।নজরুল কুমিল্লা, মেদিনীপুর, হুগলি,ফরিদপুর, বাঁকুড়া এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সভা-সমিতিতে অংশগ্রহণ করেন।নজরুলের 'লাঙ্গল' পত্রিকাটি ছিল প্রথম শ্রেণি সচেতন সাপ্তাহিক পত্রিকা।নজরুলের রাজনৈতিক জীবনের একটিন অন্যতম ঘটনা হল ১৯২৬ সালে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় আইনসভার উচ্চ পরিষদের সদস্য পদের জন্য পূর্ব বঙ্গ থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা।এরপরও নজরুল বিভিন্ন সভা সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন।


নজরুলের বাংলাদেশে আগমন 

 নজরুল বাংলাদেশে মোট কতবার এসেছেন তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই।তবে সাধারণ হিসাবে ৩০ বারের কম নয় বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশে ভ্রমণ ও অবস্থানকালে নজরুল সবচেয়ে বেশি প্রায় এক বছর ছিলেন ময়মনসিংহের দরিরামপুরে।নজরুল সবচেয়ে কম ছিলেন বরিশালে মাত্র দুদিন। বাংলাদেশ নজরুলের প্রথম আগমন হয় ১৯১৪ সালে ময়মনসিংহের ত্রিশালে দরিরামপুরে।এরপর দ্বিতীয় বার আসেন বরিশালে ১৯২০ সালে।নজরুল প্রথম কবে ঢাকায় এসেছেন তা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে।তবে বিভিন্ন বিচারে মনে করা হয় নজরুল প্রথম ঢাকায় আসেন ১৯২৬ সালের জুন মাসের শেষ সপ্তাহে।অভিবক্ত বাংলার স্বদেশী নেতা হেমন্ত কুমারের সাথে নজরুল প্রথমবার আসেন।১৯২৬ সালের অক্টোবরে দ্বিতীয়বার নজরুল ঢাকায় আসেন।মনে করা হয় নজরুল মোট ১৩ বার ঢাকায় আসেন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুল আসেন মোট ৫ বার।নজরুল সুস্থ অবস্থায় সর্বশেষ ঢাকায় আসে ১৯৪০ সালে।


নজরুল এবং সাহিত্য ভাতা

১৯৪২ সালের জুলাই মাসে কবি নজরুল অবশীর্ণতার রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পরেন।ফলে তার উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যায়।নজরুল ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জন ক্ষম ব্যক্তি।বেহিসাবি জীবন যাপন করার কারণে কোনো সঞ্চয় ছিলনা নজরুলের।উত্তরাধিকার সূত্রেও কিছু ছিলনা তাঁর।এসময় সংসার চালানোর জন্য নজরুলকে নির্ভর করতে হয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভাতার উপর।নজরুলের এ বিপদের সময় বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি অবিভক্ত বাংলার সরকারও এগিয়ে আসে।মাসিক ২০০ রুপি হারে মাসিক 'সাহিত্যিক বৃত্তি' নির্ধারিত হয় নজরুলের।দেশভাগের সময় এটা সাময়িক বন্ধ হলেও পরে আবার দুই দেশ থেকেই নজরুল ভাতা পেত।এরপর ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের সময় আবার কিছুদিন বন্ধ থাকে এই ভাতা।এর কিছুদিন পর আবার চালু হয়।১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মার্চ মাসে কবির ভাতা বন্ধ হয়ে যায়।এরপর নজরুলকে ১৯৭২ ঢাকায় নিয়ে এলে ১০০০ টাকা করে প্রতি মাসে ভাতা নির্ধারণ করে। এবং নজরুলের বাসস্থান সহ চিকিৎসার ভার সরকার বহন করে।



রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় নজরুলের বাংলাদেশে আগমন

বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের চেষ্টায় ১৯৭২ সালের ২৪ মে নজরুলকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়।কবি নজরুলকে অভ্যর্থনা জানাতে সেদিন বিমান বন্দরে উপস্থিত হয়েছিল দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব সহ কবি,সাহিত্যিক,শিল্পী এবং হাজার হাজার সাধারণ মানুষ।ঢাকায় নজরুলের জন্য নির্ধারিত বাসভবন ছিল ধানমন্ডির ২৮ নং সড়কে ৩৩০ বি বাড়িটি।নজরুলের জন্য এসময় বাংলাদেশ সরকার ১০০০ টাকা মাসিক ভাতা ঠিক করে।নজরুল রাষ্ট্রীয় অতিথি হওয়ায় তার বাসভবনের সামনে জাতীয় পতাকা উড়ানো শুরু হয়।নজরুলের চিকিৎসার সকল বিষয় নিয়ে একটা মেডিকেল বোর্ডও গঠিত হয়। ১৯৭২ সালেই নজরুলকে বাংলাদেশের জাতীয় কবি ঘোষণা করা হয়।নজরুলকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয় ১৯৭৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারী।নজরুলের জীবনের শেষ চার বছর তিনমাস পাঁচদিন কাটিয়েছেন বাংলাদেশে।



নজরুলের সম্মাননা

বাংলা সাহিত্যে নজরুলের অবিস্মরণীয় অবদানের কারণে বিভিন্ন সময়ে তিনি বিভিন্ন সম্মাননা ও পুরষ্কার লাভ করেন।কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৪৫ সালে নজরুলকে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক প্রদান করে।ভারত সরকার ১৯৬০ সালে নজরুলকে পদ্মভূষণ পদক দেন।এরপর ১৯৬৯ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি-লিট পদক দেয়া হয়।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নজরুলকে ডি-লিট উপাধি দেন ১৯৭৪ সালে।বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৬ সালে নজরুলকে একুশে পদকে ভূষিত করেন।একই বছর নজরুলকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ২৪ মে আর্মি ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।পিজি হাসপাতালে নজরুলকে এ উপহার দেন তৎকালীন উপপ্রধান সামরিক প্রশাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। এছাড়া ২০০৪ সালে বিবিসির বাংলা বিভাগ কর্তৃক কৃত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির জরিপে নজরুলকে ৩য় স্থান দেয়া হয়।



বিশ্বকবির সাথে নজরুলের সম্পর্ক

নজরুলের সাথে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক নিয়ে নানান কল্পকাহিনী প্রচলিত রয়েছে।বলা বাহুল্য এসব কল্পিত কাহিনির অধিকাংশেই তাদেরকে পরষ্পরের বিপরীতমুখী করে প্রচার করা হয়েছে।তবে বাস্তব জীবনে তাদের ব্যক্তিগত কোন বৈরিতা ছিল না।এমনকি তাদের সম্পর্ক হৃদ্যতাপূর্ণ ছিল বলেই ধরা যায়।রবীন্দ্রনাথ তরুণ কবি নজরুলের জন্য তাঁর বসন্ত গীতিনাট্যটি উৎসর্গ করেন।এটি উৎসর্গ করার পর অনেকেই মেনে নিতে পারেনি।তাঁদের উদ্দেশ্য করে রবীন্দ্রনাথ যা বলেছেন তাতে নজরুলের প্রশংসাই করা হয়েছে।হুগলি জেলে নজরুল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্বরূপ অনশন করেন প্রায় চল্লিশ দিন।রবীন্দ্রনাথ এটা জানতে পেরে নজরুলের নিকট টেলিগ্রাম পাঠান।তাতে লেখা ছিল "Give up hunger strike.Our literature claims you." যদিও এটি নজরুলের কাছে পৌঁছাতে পারেনি।১৯৩১ সালের জুন মাসে নজরুল দার্জিলিং সফর করেন।নজরুলের সেখানে থাকাকালীন রবীন্দ্রনাথও দার্জিলিং ছিলেন।তাঁর সঙ্গে নজরুলের সাক্ষাৎ হয় সেখানে। 

নজরুলের মৃত্যু

দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট সকাল ১০ টা ১০ মিনিটে নজরুল ঢাকার পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।এসময় উপস্থিত ছিলেন পিজি হাসপাতালের সুপার ডা. আশিকুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড.ফজলুল হালিম চৌধুরী ও নজরুল গবেষক রফিকুল ইসলাম।কবির মরদেহ টিএসসি প্রাঙ্গণে নেয়া হলে হাজার হাজার মানুষ তাকে দেখার জন্য ভীড় জমায়।বিকেল সাড়ে ৪টায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কাজী নজরুল ইসলামের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।এই জানাজায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান সহ বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।কবির গান "মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই" অনুসরণ করে তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ সংলগ্ন স্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।ওইদিন থেকে তিনদিন ব্যাপি জাতীয় কবির মৃত্যুতে শোক ও একদিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়।




  

পরিচিতদেরকে জানাতে শেয়ার করুন

4 Comments

দয়া করে নীতিমালা মেনে মন্তব্য করুন ??

  1. জাতীয় কবির জীবনি সংক্ষিপ্ত হলেও পুরোপুরি উঠে এসেছে,পড়ে ভালো লাগল।

    ReplyDelete
  2. Replies
    1. অনেক ধন্যবাদ আপনাকে, আমার নাম জানতে পারলে আরও ভালো লাগত

      Delete

অর্ডিনারি আইটি কী?